লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ইসরায়েলের মৃত্যুদণ্ড আইন: সুরক্ষা না ঠান্ডা মাথায় খুনের পরিকল্পনা?

প্রকাশিত: 02 এপ্রিল 2026

15 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

ইসরাইলের সংসদ নেসেট সম্প্রতি একটি বিতর্কিত “মৃত্যুদণ্ড আইন” পাস করেছে, যা বিশেষ করে ফিলিস্তিনি অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য তৈরি বলে অভিযোগ উঠেছে। এই আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের প্রাণঘাতী হামলার অপরাধ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং তা ৯০ দিনের মধ্যে কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে।

ইসরাইলের সংসদে পাস হওয়া নতুন আইন, যা সাধারণভাবে “মৃত্যুদণ্ড আইন” (Death Penalty Law) নামে পরিচিত, সরকারের ভাষায় এটি একটি সন্ত্রাসবিরোধী ব্যবস্থা।

এই আইনের মূল কথা সহজ:

  • যদি কেউ প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
  • বিচার প্রক্রিয়ার বড় অংশ হবে সামরিক আদালতে।
  • রায় কার্যকর করতে হবে দ্রুত, আপিলের সুযোগ সীমিত রেখে।
  • অভিযুক্ত ব্যাক্তিকে ৯০ দিনের মধ্যে দন্ড কার্যকরের আওতায় আনতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য, কোনো ইসরাইলি বা ইহুদি কোনো অপরাধ করলে তা সিভিল কোর্টে যাবে অন্যদিকে কোনো ফিলিস্তিনি বা মুসলিম একই অপরাধ করলে তা সামরিক আদালতে যাবে। যখন একটি রাষ্ট্র এমন আইন তৈরি করে, যেখানে একই অপরাধের জন্য এক পক্ষ পায় পূর্ণ আইনি সুরক্ষা আর অন্য পক্ষের জন্য অপেক্ষা করে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড, তখন সেটাকে “আইন” বলা যায় না, সেটাকে বলতে হয় আইনহীনতা ও দমনের হাতিয়ারকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।

কাগজে-কলমে এটি একটি কঠোর অপরাধ দমন আইন। কিন্তু বাস্তবতার প্রশ্ন এখানেই, এই আইনটি কাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হবে? ইসরাইল-অধিকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের বিচার হয় সামরিক আদালতে, যেখানে দণ্ডের হার অনেক বেশি এবং ন্যায়বিচার নিয়ে একদম শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইলি নাগরিকদের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিভিল বিচারব্যবস্থা।

এই আইন সেই বার্তাই দিচ্ছে, ‘ক্ষমতা যার হাতে, বিচারও তার নিয়ন্ত্রণে’। যে দেশের আইনপ্রণেতারা বা প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিরা কারারক্ষীদের ফিলিস্তিনি কারাবন্দীদের ধর্ষণের মতো নোংড়া কাজের অনুমতি দিতে পারে বা দেড় বছর বয়সী শিশুকে তার বাবার সামনে সিগারেটের আগুন দিয়ে ক্রমাগত পোড়াতে পারে, এমন পাশবিক ব্যাবস্থার কাছে ন্যায় বা নৈতিকতা আশা করা চূড়ান্ত বোকামি ছাড়া আর কি হতে পারে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য সামরিক আদালত, দ্রুত রায়, সীমিত আপিল, আর অন্যদিকে ভিন্ন এক বিচারব্যবস্থা। প্রশ্নটা খুব সরল: ন্যায়বিচার কি সবার জন্য সমান?

আইনটি কাগজে “সন্ত্রাসবিরোধী” হলেও বাস্তবে এটি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপরই  প্রয়োগের জন্য তৈরী, এটা এখন আর অনুমান নয়, বরং কাঠামোগত বাস্তবতা।

বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা দরকার, ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের দখল করা ভূমির উপর গড়ে উঠেছে। এটি যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এই ভাবনাটিই তো প্রশ্নবিদ্ধ। সে আবার আইন প্রণয়ন করছে? বিশ্ব পরাশক্তিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সে রাষ্ট্র হিসেবে বেড়ে উঠতে চাইছে অথচ বিশ্বের অনেক সচেতন দেশই তাকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকার তো করেই না বরং লুটেরা, অমানবিক ও গণহত্যাকারী মনে করে। অথচ দখলদার তাঁর দখলদারিত্বের অনিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছে ভূমি মালিকের উপরে।

সদ্য পাস্ করা এই আইনটির বার্তা অত্যান্ত পরিষ্কার : “আমরা শুধু নিয়ন্ত্রণ করবো না, প্রয়োজনে শেষ করে দেব।” এটাই কি আইনের কাজ? নাকি এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা আইনের ভাষা ব্যবহার করে দমন-পীড়ন ও হত্যাকে বৈধতা দিচ্ছে? ঠান্ডা মাথার গণহত্যা পরিকল্পনাকে আইনগত ভিত্তি প্রদান করছে।

“গণহত্যা” শব্দটি হয়তো বিতর্কের বিষয়, কিভাবে? পশ্চিমা দুনিয়া কেউ যদি একটি পাখি বা কোনো পশুকে কষ্ট দেয় বা হত্যা করে তখন পুরা পশ্চিম হায় হায় করে ওঠে, তাদের মানবিক চেতনা পূর্ণমাত্রায় জাগ্রত হয়। তাঁরা নানান আইন কানুন নিয়ে হাজির হয় এবং দোষী ব্যাক্তির শাস্তিও হয়।  এটা খুবই ভালো দিক কিন্তু ফিলিস্তিনের গাজায় যখন মানুষের সন্তান শিশু, মহিলা বা বৃদ্ধদের হত্যা করা হতে থাকে এবং যাদের যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ততা নেই, অথবা ঠিক এই মুহূর্তে লেবাননে ও ইরানে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের জবাই করা হচ্ছে প্রতিদিন মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ প্রযোজনায়, কিন্তু এই পশ্চিমারা এখন নীরব, তাদের নীরবতা তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ বহন করে। গণহত্যার ব্যাখ্যা হয়তো তাদের কাছে ভিন্ন। এই পশ্চিমারাই কিন্তু ধর্মান্ধ, গণহত্যাকারী উগ্র ইজরাইলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

এটা খুবই দুঃখজনক যে, অনেক আরব দেশ গোপনে এই গণহত্যাকারী শাসকদের সমর্থন করছে, যে শাসকরা জাতিগতভাবেই আরবদেরকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভ আর বিলাসী জীবনের মোহে তারা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে যে, সামনের ভীষণ পরিণতি তারা দেখতে পাচ্ছে না। তারা কি বুঝতে পারছে না যে, একবার এই গণহত্যাকারীরা তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পারলে, তারা সবার আগে আরবদের দিকেই ঘুরে দাঁড়াবে? গণহত্যাকারীরা তাদেরকেও ভেড়ার পালের মতো তাড়িয়ে নিয়ে হিংস্র নেকড়ের মতো হত্যা করবে।

ক্ষমতার লোভ, বিলাসিতা আর লজ্জাজনক উদাসীনতা শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধ্বংস করবে। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে দশকের পর দশক ধরে বয়ে বেড়ানোর অপমান ও লাঞ্ছনা।

যখন একটি জনগোষ্ঠী বারবার একই ধরনের কঠোর আইন, বৈষম্যমূলক বিচার, এবং দমনমূলক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন প্রশ্ন উঠবেই,  এটি কি কেবল নিরাপত্তা, নাকি একটি জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করে দেওয়ার প্রক্রিয়া? ইতিহাস বলে—বড় অন্যায়গুলো হঠাৎ করে শুরু হয় না। শুরু হয় ছোট ছোট “আইনি পরিবর্তন” দিয়ে।

আজকের এই আইন! সেই গল্পের আরেকটি অধ্যায় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman