দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব আঞ্চলিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ তা বলাই বাহুল্য। একটি বড় ও প্রভাবশালী প্রতিবেশী রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই নতুন নীতির সম্ভাবনা, নতুন কৌশল, এবং কখনো কখনো নতুন উদ্বেগ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার বাইরে গিয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তা অনেক প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, প্রশাসনিক ভূমিকা, এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা কেবল একটি রাজ্যের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে জড়িত।
বিজেপির হিন্দুত্ববাদী আদর্শ পশ্চিমবঙ্গের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজ্যে কী রূপ নেবে, তা নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে ধর্মীয় উগ্রতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠী, এখন চাপের মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যবাহী বাংলার মুখ পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুত্ববাদী ও সহনশীল সমাজের প্রতীক। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে বিভাজনের প্রবণতা বেড়েছে। বিজেপি’র বিজয়ে এই প্রবণতা আরও তীব্র হবে, এটি অচিরেই সামাজিক সম্প্রীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যা শুধু একটি রাজ্যের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয়। অর্থনীতি, পানি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি এ সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এই সম্পর্কের কিছু দিককে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রথমত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করা হলে সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব পড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, অভিবাসন ও নাগরিকত্ব ইস্যু, যা ইতিমধ্যেই দুই দেশের আলোচনায় সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে রয়েছে। তৃতীয়ত, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বিশেষ করে তিস্তা ইস্যু, যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতীয় জনতা পার্টির অনেকেই বিশেষ করে সদ্য বিজয়ী শুভেন্দু এখনও তাঁকে বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী বলে দাবি করে যাচ্ছে। এটি কেবল কূটনৈতিক অশোভনতা নয়, বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের স্পষ্ট ইঙ্গিত। হাসিনা-আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে বিজেপি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনকে অস্বীকার করছে। এমন নির্লজ্জ অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে। এছাড়া, আঞ্চলিক রাজনীতিতে পারস্পরিক সম্মান ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো পক্ষ যদি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে অবস্থান নেয়, তা সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তববাদী ও আত্মনির্ভর কৌশল গ্রহণ করা। রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যত শক্তিশালী হবে, বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা তত সহজ হবে। বাংলাদেশকে একদিকে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে নিজের স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। আন্তর্জাতিক ফোরামে সক্রিয় ভূমিকা এই ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এটি কোনো সংঘাতের জন্য নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ইতিহাস দেখিয়েছে, অতিরিক্ত মেরুকরণ কোনো সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনে না। একইভাবে, প্রতিবেশী দেশের পরিবর্তনকে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ এই দুই দিক থেকেই দেখা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঐক্য, কৌশল এবং আত্মবিশ্বাস। আমরা যদি নিজেদের ভিত মজবুত রাখতে পারি, তাহলে যেকোনো আঞ্চলিক পরিবর্তনের মধ্যেও স্থিতিশীল ও সম্মানজনক অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব।
