দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।
সম্প্রতি কাবুলের ওমিদ অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল। রমজানের ইফতারের পর নামাজরত রোগীদের ওপর পাকিস্তানি বিমান হামলায় তালেবান সরকারের দাবি অনুসারে ৪০০ জন নিহত, ২৫০-এর বেশি আহত। হাসপাতালের বড় অংশ ধ্বংস, আগুনে পুড়ে মারা গেছেন অনেকে। পাকিস্তান বলছে, এটি “নির্ভুল” হামলা ছিল সন্ত্রাসী স্থাপনার ওপর। আফগানস্থান বলছে, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই ঘটনা শুধু সাম্প্রতিক নয়, এটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান ‘ওপেন ওয়ার’-এর একটি ভয়াবহ অধ্যায়।
পাকিস্তান কেন যুদ্ধ করছে? মূল কারণ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি’র হামলা তীব্র হয়েছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা ৩৪% বেড়েছে, নিহত হয়েছে ৪০০০-এর বেশি (পাক ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ)। টিটিপি আফগানস্থানের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় পায় বলে পাকিস্তানের অভিযোগ। তালেবান অবশ্য বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এছাড়াও দুরান্ড লাইন নিয়ে দেশ দুইটির মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধও আছে।
এখন কথা হচ্ছে এই যুদ্ধ কি দুই দেশ স্বাধীনভাবে নিজেদের ইচ্ছায় বুঝে শুনে করছে ? কিছু বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। অল্প কিছু দিন আগেই আমেরিকা আফগানস্থানের ভেতরের বাগরাম ঘাঁটি দাবি করে বসে। স্বাভাবিকভাবেই তালেবান তা অশ্বিকার করে। পাকিস্তানে মার্কিন প্রভাব স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক বেশী, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইমরান খান, যিনি এক প্রকার বিনা দোষেই এখনো নির্মম কারাবাসে করছেন। অন্যদিকে আফগানস্থানে ভারতও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছে। অভিযোগ আছে নানান সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তারা তালেবান সহ বিদ্রোহী গোষ্ঠী যেমন টিটিপি (তেহেরিকি তালেবান পাকিস্তান) বিএলএ (বেলুচ লিবারেশন আর্মি) সহ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে।
এটা সকলেরই জানা জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান ও ভারত দেশ দুটি একে অপরের ঘোরতর শত্রু। আবার ইরানকে হামলা করেছে মার্কিন-ইজরাইলি জোট, এখানে আবার ভারত ইজরায়েলের পরম মিত্র এবং সব রকম সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন- ইজরাইল জোট ইরানে আক্রমন করে দারুন ভাবে ফেঁসে গেছে। ইরানকে তারা যতটা দুর্বল ভেবেছিল কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। বরং তারাই এখন মরিয়া হয়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইছে। ইরানের মিসাইল ও ড্রোন তান্ডবে মদ্ধপ্রাচ্যের প্রায় সব কয়টি মার্কিন ঘাঁটি উড়ে গেছে আর ইজরাইল এর বড় বড় শহরগুলো লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রানের উপায় হিসাবেই কি পাকিস্তান যুদ্ধকে আরো উস্কে দেওয়া হলো কি না তাও বিবেচনার দাবি রাখে বলেই আমি মনে করি।
যে কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বিশেষ করে স্কুল এবং হাসপাতালে হামলা ভীষণ নিন্দনীয় এবং এটি ইজরাইলি কাজ। পাকিস্তানের অবশ্যই জানাতে হবে, কেন তাদের চেয়ে অনেক দুর্বল সামরিক শক্তির একটি দেশের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে হলো। তারা যেটি বলেছে যে, এখানে টিটিপি বা সন্ত্রাসী ঘাঁটি ছিল তারা কিন্তু তা প্রমান করতে পারেনি।
আফগানস্থানেরও ভেবে দেখা উচিৎ যে তারা যদি সত্যিই ভারতের প্ররোচনায় কোনো পদক্ষেপ নিয়ে থাকে তা পুনর্বিবেচনা করা। এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, এই অঞ্চলে ভারতের কোনো বন্ধু নেই। ভারত, মার্কিন পদচিহ্ন অনুসরণ করে এই অঞ্চলের প্রভু হতে চেয়েছিল কিন্তু সব জায়গা থেকেই তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। শুধু মূলসলিম দেশ নয়, অমুসলিম দেশ যেমন শ্রীলংকা এবং নেপালেও তারা প্রত্যাখ্যাত। আফগানস্থানের এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে ভারত তাদের বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্র। তার উপর ভারত আবার আফগানস্তানকেও অখণ্ড ভারতের অংশ হিশেবে দেখতে চায়। অর্থাৎ, তাদের আগ্রাসী নীতি পরিষ্কার। এই অবস্থায় যে কোনো অসচেতন পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত অনেক বড় দুর্ভোগ ডেকে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ভারতের অবশ্য একটা বক্তব্য আছে, তারা বলছে তারা আফগান তালেবানদের উন্নয়ন সহযোগী এবং মানবিক সহায়তা দানকারী! অথচ আফগানিস্তান, মার্কিন আগ্রাসন মুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত ভারত সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায় থেকে সবসময়ই তালেবান সম্পর্কে বলা হত তারা ‘সন্ত্রাসী’, এই পরিভাষার বাইরে তারা অন্য শব্দ ব্যবহার করেনি। খোদ মোদী এক ভাষণে বলেছিল “ভালো বা মন্দ তালেবান বলে কিছু হয় না, সবাই সন্ত্রাসী।”
কিন্তু পাকিস্তানের অভিযোগ যে ভারত আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানকে দুই ফ্রন্টে ব্যস্ত রাখতে চায়। প্রমাণ সরাসরি কম, তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সূত্রে এই অভিযোগ বারবার উঠেছে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, লাভবান তারাই হবে যারা দেশ দুটিকে ঘৃণা করে। অথচ কৃষ্টি কালচার, জীবনাচরণের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট প্রায় সবই এক এবং ধর্মও সম্পূর্ণরূপে এক হওয়ার পরেও তারা একে অপরের সাথে প্রাণঘাতী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিগত ভাবে দুটো দেশই ব্যাপক ধর্মানুরাগী, অথচ তারা এক অপরকে এই ধর্মের নাম নিয়েই আক্রমন করছে। যেমন, পাকিস্তান আফগানিস্তানকে বলেছে ‘খারেজী’ আর আফগানিস্থান পাকিস্তানকে বলেছে ‘মুরতাদ আর মুনাফেক’ !
দুটি দেশের কোনোটিই অর্থনৈতিক, শিক্ষা, চিকিৎসা,বেকার সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগতভাবে শক্তিশালী নয়, অথচ তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ! তাদের কি এটা ভাবার মতোও অবকাশ নেই যে তাদের মধ্যেকার বিরোধে কে বা করা লাভবান হচ্ছে? অথবা তারা কি এই যুদ্ধ থেকে আদৌ লাভবান হবে কি না? এই যুদ্ধ তো তাদের আরও ২০ বছর পিছিয়ে দেবে। বরঞ্চ হওয়া তো উচিত ছিল এমনটা যে একে অন্যকে পারস্পারিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহায়তা করবে।
আমি বলব, এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের দায়িত্ব বেশি, কেন? কারণ পাকিস্তান শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অপেক্ষাকৃত বেশী শক্তিশালী। ঢালাওভাবে একটা দেশের উপর আক্রমন না করে, পাকিস্তান তার গোয়েন্দা সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের অপরাধীদের আটক করতে পারে এবং পাকিস্তানের সেই সক্ষমতা আছে। আফগানিস্তান দরিদ্র, যুদ্ধবিধ্বস্ত। শক্তিশালী পক্ষেরই বেশি সংযম দেখানো উচিত। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে হলেও কূটনৈতিক পথ অবলম্বন করে আফগানিস্তানে কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কারিগরি জ্ঞান ও কর্ম সংস্থান সৃষ্টির মতো সহায়তা করে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা পাকিস্তনের দায়িত্বও বটে।
এই মুহূর্তে আফগানিস্তানের উচিত পাকিস্তানের দাবিগুলোকে আমলে নিয়ে টিটিপি কে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা। যুদ্ধ বন্ধে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই দুটি দেশের সাথেই চীনের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বেশ উন্নত। চীনের যথেষ্ট বিনিয়োগও আছে দেশ দুটিতে। সর্বপরি শান্তি স্থাপনে পাকিস্তান ও আফগানস্থানকেই সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন ও অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। নিজেদের অন্যের ক্রীড়ানক না বানিয়ে নিজেরাই নিজের ভালোমন্দ নির্ণয় করার সাহস ও ক্ষমতা রাখতে হবে। এতে করে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও শান্তির পথ উন্মুক্ত হবে।
এই যুদ্ধ দুই মুসলিম দেশের মধ্যে কেউ জিতবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ হেরে যাবে। সব বিভেদ ভুলে এখনই শান্তির পথে ফিরে আসা উচিত, নচেৎ ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
