লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

একজন প্রফেসর, “দেশ বিক্রি” ও রপ্তানি অর্থনীতি

প্রকাশিত: 11 মে 2026

30 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । আরিফুল ইসলাম আরিফ ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “দেশ বিক্রি” শব্দবন্ধটি খুব শক্তিশালী একটি অস্ত্র। আবেগ, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ঘৃণার মিশেলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয় যেখানে জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতাও খুব সহজে “ষড়যন্ত্র” হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, সেটিও অনেকটা সেই ধারারই অংশ বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা কী অথবা কি ছিল? ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করে। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি ছিল ভয়াবহ সংকেত। কারণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। শুধু ২০২৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমেরিকান বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তার সরাসরি আঘাত পড়ত। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড. ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তিকে খুব মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।

সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে ট্যারিফ কমানো নিয়ে। সামাজিক মাধ্যমে বারবার বলা হয়েছে, “৩৭ শতাংশ থেকে মাত্র ১ শতাংশ কমানো হয়েছে।” অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে প্রথমে ২০ শতাংশে এবং পরে ১৯ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ কার্যত ১৮ শতাংশ কমানো হয়। এটাকে “মাত্র ১ শতাংশ” বলা অর্থনৈতিক তথ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা ছাড়া কিছু নয়।

তবে চুক্তির আসল গুরুত্ব অন্য জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তৈরি পোশাক বানানো হলে সেই পোশাক আমেরিকান বাজারে “জিরো ট্যারিফে” প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে বড় কৌশলগত অর্জন।

এখানে ভারতের অস্বস্তির কারণও স্পষ্ট। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই তুলার বড় অংশ ভারত থেকে আমদানি করে। ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন শুল্ক সুবিধা ভারতীয় তুলা ও পোশাক খাতের ওপর প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যম ও ইউটিউব ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়ায় সেই উদ্বেগ স্পষ্টভাবেই দেখা গেছে। ভারতীয় তুলা বাংলাদেশ কম আমদানি করলে বা একেবারেই না করলে ভারত নিশ্চই অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকবে এবং এক কথায় তাদের তৈরী ও প্রতিযোগিতাহীন বাংলাদেশী বাজার তারা হারাবে। এই চিন্তা থেকেই ভারতীয় প্রোপাগান্ডা যন্ত্রগুলো সচল হয়ে ওঠে।

সমালোচকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, বাংলাদেশ কেন হাজার হাজার মার্কিন পণ্যে শুল্ক ছাড় দিল? শুনতে বিষয়টি ভয়ংকর লাগলেও বাণিজ্যিক বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। যেসব ৬,৭১০টি মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশ ছাড় দিয়েছে, তার বড় অংশই বাস্তবে আমদানি হয় না বা খুব সীমিত পরিসরে হয়। আবার যেসব বাংলাদেশি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে সুবিধা পাবে, তার মধ্যেও অধিকাংশ এখনো উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অর্থাৎ তালিকাগুলোর বড় অংশই প্রতীকী। আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি প্রফেসরের আসল যুদ্ধ ছিল পোশাক খাতকে রক্ষা করা।

বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এখানেও বাস্তবতা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে জটিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বহু বছর ধরেই বোয়িং নির্ভর বহর পরিচালনা করছে। হঠাৎ করে এয়ারবাস যুক্ত করলে নতুন প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামো খরচ তৈরি হতো। এমনকি শেখ হাসিনার সরকারও ২০২৩ সালে এয়ারবাসের একটি প্রস্তাব “অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক” বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বা অস্বাভাবিক বলা কঠিন।

কৃষি ও জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যে বড় সুবিধা নিতে গেলে কিছু ছাড় দিতেই হয়। যুক্তরাষ্ট্র কেন বিনা কারণে বাংলাদেশের জন্য বাজার খুলে দেবে? বরং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনকও হতে পারে। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশ কৃষিপণ্য ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একক নির্ভরতার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে এত বড় “দেশ বিক্রি” তত্ত্ব এলো কোথা থেকে?
এখানে রাজনীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই ড. ইউনূসকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে এসেছে। অন্যদিকে বিএনপির একটি অংশও বুঝতে পারে, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য কোনো বিকল্প নেতৃত্ব তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করতে পারে। ফলে দুই পক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলে গেছে, ড. ইউনূসকে বিতর্কিত করা।

আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ একা নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর বাণিজ্য নীতির মুখে ভারতসহ বহু দেশই ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। ভারতও শুল্ক কমিয়েছে এবং বড় অঙ্কের আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল বাংলাদেশের দুর্বলতা ছিল না, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য চাপের অংশ।

এই চুক্তি নিখুঁত ছিল না। কোনো বাণিজ্য চুক্তিই নিখুঁত হয় না। কিন্তু সেটিকে “দেশ বিক্রি” হিসেবে দেখানো রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও অর্থনৈতিকভাবে সৎ বিশ্লেষণ নয়।

দলীয় আবেগের বাইরে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় বিচার করলে দেখা যায়, ড. ইউনূস সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতকে রক্ষা করা। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু সেটিকে রাষ্ট্র বিক্রির গল্প বানানো বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার কাছাকাছি।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman