লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

আফগান মুজাহিদ মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের বাড়িতে ডেল্টা ফোর্সের ব্যার্থ অভিযান: যে কাহিনি যুক্তরাষ্ট্র ভুলে যেতে চায়

প্রকাশিত: 05 জানুয়ারী 2026

374 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস | যুগের গল্প ।

গতকাল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শীর্ষ জেনারেল ও মন্ত্রীদের পাশে বসে এক সংবাদ সম্মেলনে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তারের নাটকীয় কাহিনি শোনাচ্ছিলেন, তখন তিনি কথা শুরু করেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ডেল্টা ফোর্সের ভূয়সী প্রশংসা দিয়ে। তাঁর ভাষায়, ডেল্টা ফোর্স পৃথিবীর সবচেয়ে প্রশিক্ষিত, দ্রুততম ও কার্যকর বাহিনী। দাবি করা হয়, এক নিখুঁত অভিযানে তারা কোনো রক্তপাত ছাড়াই ভেনেজুয়েলার নেতাকে ও তাঁর স্ত্রীকে জীবিত আটক করতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু এই প্রশংসার মুহূর্তেই ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর অধ্যায় নতুন করে মনে করিয়ে দেয় বাস্তবতা।

এই একই ডেল্টা ফোর্সই আফগানিস্তান আক্রমণের শুরুতে মোল্লা মুহাম্মদ ওমরকে জীবিত আটক বা হত্যার উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ অভিযান চালিয়েছিল। ট্রাম্প যে বাহিনীকে আজ “বিশ্বসেরা” বলছেন, আফগান মাটিতে সেই বাহিনীর অভিজ্ঞতা কী ছিল, তার বিবরণ পাওয়া যায় ‘তৃতীয় ওমর গ্রন্থ’-এর ২৬৮ নম্বর পাতায়।

সেখানে লেখা আছে, ২০০১ সালের ২০ অক্টোবর। আফগানিস্তান আক্রমণের একেবারে শুরুর দিক। মার্কিন বাহিনী কন্দাহার শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি ভবনকে লক্ষ্য করে অভিযান চালায়। এটি ছিল মোল্লা ওমরের বাসস্থান এবং একই সঙ্গে তালেবান আমিরাতের কার্যত সদর দপ্তর।

আমেরিকান সূত্র অনুযায়ী, এই অভিযানের জন্য ডেল্টা ফোর্সের প্রায় একশ’ কমান্ডোকে প্রথমে রেগ অঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে নামানো হয়। স্থানটি কন্দাহার থেকে প্রায় ৬০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। প্রয়োজনে মূল অভিযানে সহায়তা দেওয়াই ছিল তাদের কাজ।

এরপর সেই রাতেই আরও একশ’র বেশি ডেল্টা ফোর্স ও অন্যান্য কমান্ডো নিয়ে গঠিত দ্বিতীয় দল হেলিকপ্টারে করে কন্দাহারের কাছে মোল্লা ওমরের বাড়িতে হানা দেয়। নামার সঙ্গে সঙ্গেই আকাশে চক্কর দেওয়া হেলিকপ্টার ও কমান্ডোরা সম্ভাব্য সব হুমকি দমনে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

কিন্তু শুরুতে কোনো প্রতিরোধই ছিল না। কারণ, মোল্লা ওমরের ঘর আগেই খালি করা হয়েছিল। পাহারায় থাকা মুজাহিদিনরা জানতেন, ভেতরে ঢুকলেও আমেরিকানরা কাউকে পাবে না।

কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে যায়। কন্দাহার শহর থেকে সহায়তাকারী মুজাহিদিনরা এলাকায় পৌঁছালে তারা আকস্মিকভাবে মার্কিন বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করে। এরপর যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা ডেল্টা ফোর্সের পরিকল্পনার অংশ ছিল না।

তদন্তমূলক সাংবাদিক সেমুর হার্শ তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমেরিকান কমান্ডোদের উদ্ধৃতি দিয়ে সেই মুহূর্তের বিবরণ দেন: “যখন আমরা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন তালেবানরা আমাদের ওপর নরক নামিয়ে আনে। হালকা অস্ত্র ও আরপিজি দিয়ে আকস্মিক আঘাত করা হয়। এমনভাবে হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া হচ্ছিল, যেন তাদের কাছে অসীম মজুত রয়েছে। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ডেল্টা ব্যাটালিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বেশ কয়েকজন আহত হয়। বাহিনী ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়, যাতে বড় দলগুলো পালানোর সুযোগ পায়।”

হার্শ লেখেন, সেই সময় যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারগুলো মোল্লা ওমরের বাড়িতে নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। আতঙ্কিত ও বিশৃঙ্খল হয়ে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স পালানোর সময় একটি চিনুক হেলিকপ্টারের চাকা পাহাড়ে আঘাত পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একজন কমান্ডোর স্বীকারোক্তি ছিল আরও স্পষ্ট ও বিব্রতকর: “আমরা ভেবেছিলাম সেখানে পৌঁছেই জাদু দেখাব। কিন্তু তালেবানদের আক্রমণের পর বুঝে গেলাম, আমরা কোনো জাদুকর নই।”

এই স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রথম বিশেষ অভিযানে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ বাহিনীকেই নামিয়েছিল। কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য।

পরবর্তীতে তালেবানরা গণমাধ্যমের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন হেলিকপ্টারের চাকা ও ফেলে যাওয়া একটি পিস্তল প্রদর্শন করে। সেগুলো শুধু যুদ্ধের স্মারক ছিল না, বরং আতঙ্কিত পিছু হটার নীরব সাক্ষ্যও বহন করছিল।

আজ, দুই দশক পর, ডেল্টা ফোর্সের সাফল্যের গল্প যখন আবার শোনানো হয়, তখন এই অধ্যায়টি নীরবে মনে করিয়ে দেয়—সব অভিযানের কাহিনি বিজয়ের হয় না।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman