দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক । বিশেষ প্রতিবেদন ।
রাজধানী ঢাকায় মোটামুটি অর্ধঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। মতিঝিল, ধানমন্ডি-২৭, নিউ মার্কেট, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৩০ মিনিটের ভারী বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যায়। মতিঝিলের দৈনিক বাংলা মোড়, ধানমন্ডি-২৭ নম্বর সড়ক, নিউ মার্কেটের আশপাশের এলাকা, শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়ায় পানি কোমর সমান উচ্চতায় উঠে যায়। ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং পথচারীরা আটকে পড়েন। অনেকে জুতা-মোজা খুলে কোমর পানিতে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে বাধ্য হন।
নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঢাকায় জলাবদ্ধতার মূল কারণ দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইনগুলো বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়।

রাজধানীর কাজীপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহিম উদ্দিন (৫২) বলেন, “প্রতি বছর বর্ষা আসার আগে ড্রেন পরিষ্কারের নামে শুধু লোক দেখানো কাজ হয়। বৃষ্টি হলেই আবার একই অবস্থা। এবার তো মাত্র ৩০ মিনিটের বৃষ্টিতেই এই অবস্থা।”
জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নাগরিকদের অসচেতনতা। রাস্তায়, ফুটপাতে ও খোলা ড্রেনে অবাধে প্লাস্টিকের ব্যাগ, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা ফেলার কারণে ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইন একেবারে জ্যাম হয়ে যায়। বিশেষ করে নিউ মার্কেট, মতিঝিল ও ধানমন্ডি এলাকায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ফেলে দেওয়া পলিথিন ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি অকেজো করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরিবেশবিদদের মতে , প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ করার আইন থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় এ সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ড্রেনেজ লাইনের উন্নয়ন ও মেরামত কাজে ঠিকাদাররা যথাযথভাবে করছেন না। অনেক প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ঠিকাদারদের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর কমলাপুর এলাকার একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয় ড্রেনেজ উন্নয়নে। কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো উন্নতি দেখা যায় না। সব টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যায়।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে থেকে জানা যায়, “বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে পাম্পিং মেশিন চালু করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী কাজ চলছে।” তবে নাগরিকরা এ ধরনের বক্তব্যকে ‘পুরনো কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। অনেক স্থানে পানিতে মিশে যাওয়া আবর্জনা থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী সমাধানের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিমুক্ত ঠিকাদারি কাজ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
