দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।
ত্রাভাঙ্কোর রাজ্য, আজকের দক্ষিণ কেরালা। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ। নিচু জাতের নারীদের জন্য একটা পৈশাচিক নিয়ম ছিল, শরীরের উপরের অংশ ঢাকা যাবে না। মন্দির, বাজার, ক্ষেত খামার ও কাজের সময় যেখানেই যাও না কেনো সবসময় খোলা গায়েই যেতে হতো। উচ্চবর্ণের পুরুষদের বিকৃত কুবাসনা চরিতার্থ আর জাতের “নিচুত্ব” মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই এই নিয়ম।
আর যদি কোনো নারী বলত, “আমি একটা কাপড় দিয়ে বুক ঢাকব”? তখন রাজকর্মচারী এসে বলত, “পারবে, কিন্তু এই জন্য খাজনা দিতে হবে।” নাম ছিল মুলাক্কারাম, ‘স্তনকর’।
এই কর নির্ধারণের মাত্রা ছিল আরো বিকৃত, কুরুচিপূর্ন আরো ভয়াবহ। কর নির্ধারণ হতো স্তনের আকার দেখে। বড় হলে বেশি টাকা, ছোট হলে কম। যে টাকা দিতে পারত না, তার শরীর থাকত উন্মুক্ত। লজ্জা নয়, এটা ছিল জাতপাতের নিষ্ঠুর খেলা।
এই অন্ধকারেই একদিন আলো জ্বলে উঠল। মহীশূরের বাঘ টিপু সুলতান। তিনি যখন মালাবার দখল করলেন ১৭৮০-এর দশকে, তখন এই নিয়মের কথা শুনে রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি স্পষ্ট আদেশ জারি করলেন:
১. কোনো নারীকে জোর করে উলঙ্গ রাখা যাবে না।
২. শরীর ঢাকা তাদের মৌলিক অধিকার।
৩. মুলাক্কারাম বাতিল।
টিপুর সেনারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই ঘোষণা পৌঁছে দিল। যে কর আদায়কারীরা বাধা দিল, তাদের গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া হলো। টিপুর শাসনামলে কেরালার নিচু জাতের নারীরা প্রথমবারের মতো তাদের লজ্জা নিবারণে বক্ষদেশ ঢাকতে পারলো, ফিরে পেলো সম্মান। টিপু চলে গেলেও তাঁর এই আদেশ রয়ে গেল।
কিন্তু স্বাধীনতার পরেও ত্রাভাঙ্কোরের কিছু অংশে এই প্রথাকে লুকিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৮০০-এর দশকের মাঝামাঝি চেরথালার কাছে এক গ্রামে বাস করতেন নাঙ্গেলি। এঝাভা সম্প্রদায়ের সাধারণ নারী। কর আদায়কারী এলে তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করলেন। বললেন, “আমার শরীর ঢাকার জন্য ট্যাক্স দেব না।”
কর্মচারীরা তাকে অপমান করল, হুমকি দিল। নাঙ্গেলি বাড়ি ফিরে এসে একটা অস্ত্র নিলেন। তারপর নিজের দুটো স্তন কেটে কলাপাতায় মুড়ে কর আদায়কারীর পায়ের কাছে ছুড়ে দিলেন। রক্তে ভেসে গেল মাটি। পরদিন সকালে নাঙ্গেলি মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর সেই রক্তের দাগে ভেসে গেল মুলাক্কারাম। রাজা ভয় পেয়ে প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হলো। সেই থেকে চেরথালার ওই জায়গার নাম হয়ে গেল মুলাচিপ্পরম্বু বা স্তনকাটা জমি।
ভারতবর্ষের কুপ্রথা এমনি এমনি চলে যায়নি, এটি যেমন তৎকালীন বর্বর শাসকরা নিজেদের বড়ত্ব দেখাবার জন্য তৈরী করেছিল তেমনি টিপু সুলতানের মতো মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ শাসক ও নিপীড়িতের পাশে ছিলেন, সাহস জুগিয়ে ছিলেন, মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন।
একদিন এই কাপড় পরার জন্যই নারীচ জাতের নারীদের ট্যাক্স দিতে হতো, আর একজন নারী নিজের রক্ত দিয়ে সেই কর মিটিয়েও দিয়েছিলেন।
টিপু সুলতান আর নাঙ্গেলি এই দুজনের নামই আজ কেরালার মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। কারণ তারাই প্রমাণ করেছিলেন: মানুষের লজ্জা কখনো করের জিনিস হতে পারে না।
