লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

এটাই সময় দিল্লি ও কলকাতা একই নদীর পানি পান করার

প্রকাশিত: 12 মে 2026

33 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । শাহরিয়ার ফিরোজ ।

কখনো কখনো কূটনীতি দুই প্রতিবেশীর মতো হয়ে যায়, যারা শেষ বালতির পানি নিয়ে ঝগড়া করছে অথচ একই সঙ্গে পরস্পরকে চা খাওয়ার দাওয়াত দিচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ এই ভূগোল, রাজনীতি, আবেগ ও ব্যাঙ্গাত্মক রসিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণের প্রতীক হয়ে আছে। তবে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো আমরা এমন কিছু ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি যে, নদী হয়তো এবার সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার দিকেই প্রবাহিত হতে পারে।

তবে ঢাকার বিগত সরকারগুলো এই চুক্তিকে নয়াদিল্লির শুভেচ্ছার পরীক্ষা হিসেবে দেখেছে, অন্যদিকে ভারত বারবার কূটনৈতিক অঙ্গীকার ও দেশীয় রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার দোহাইয়ের মধ্যে আটকে পড়ছে। ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময়ে যে প্রায়-সাফল্য এসেছিল, তা এখনও আমাদের কূটনৈতিক স্মৃতিতে শিলাইদহ স্টেশনে মিস করা ট্রেনের মতোই ঝাপসা হয়ে আছে — ট্রেনটি ঢাকার এত কাছে, অথচ চিরকালের জন্য বিলম্বিত।

তবু তিস্তা শুধু একটি জলবিদ্যুৎ বিরোধের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে উঠেছে। এটি কূটনীতি, যুক্তরাষ্ট্রীয়তন্ত্র, নির্বাচনী রাজনীতি, কৃষি, আঞ্চলিক পরিচয় এবং জাতীয় স্বার্থের সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা প্রায়ই দেরিকে দিল্লির রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির প্রশ্ন হিসেবে দেখেছে। দিল্লি নীরবে কলকাতার দিকে ইঙ্গিত করেছে। আর কলকাতা স্বাভাবিকভাবেই কৃষক ও স্থানীয় ভোটারদের উদ্বেগের দিকে আঙুল তুলেছে। এর মাঝখানে তিস্তা নদী বয়ে চলেছে, যদিও সবসময় কূটনৈতিকভাবে নয়।

এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন বারবার প্রস্তাবিত চুক্তি আটকে দেওয়া অবিচল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার উদ্বেগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিল না। উত্তরবঙ্গের কৃষকরা সেচের জন্য তিস্তার পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নয়াদিল্লি রাজ্য সরকারের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না করেই তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করতে চেয়েছে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পানি সাংবিধানিকভাবে রাজ্যের বিষয়, তাই দুই রাজধানীর মধ্যে সাধারণ দ্বিপাক্ষিক হ্যান্ডশেকের চেয়ে নদী বণ্টন অনেক জটিল।

কিন্তু রাজনীতি, নদীর মতোই, গতিপথ বদলায়। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে — ২৯৪টির মধ্যে ২০০+ আসন জিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।

এই অভূতপূর্ব ও অপ্রত্যাশিত বিজয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার তিস্তা আলোচনায় একেবারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রথমবারের মতো একই রাজনৈতিক শক্তি সম্ভাব্যভাবে নয়াদিল্লি ও কলকাতা উভয় জায়গায় সরকার গঠন করতে পারে। এই রাজনৈতিক সংযোজন আগের আলোচনাগুলোকে আটকে রাখা সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধাগুলোর একটি সরিয়ে দিতে পারে। যা জোট-যুগের দর কষাকষিতে সম্ভব হয়নি, তা এখন সমন্বিত শাসনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে ব্যবস্থাপনাযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

অবশ্যই, আশাবাদী হওয়া উচিত না খুব বেশি, না খুব কম। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের অধীনেও সেচ, কৃষি ও পানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগগুলো জাদুকরীভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবে না। নদী পার্টির ইশতেহার মানে না, জলবিদ্যা মানে। তবে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় আলোচনা, দর কষাকষি ও বাস্তবায়নকে অনেক সহজ করে দিতে পারে। আমরা এখন উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছি — দিল্লি ও কলকাতা যখন একই রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলবে এবং একই নদীর পানি পান করবে। পানি এখন মনে হচ্ছে অনেকটাই আশাপ্রদভাবে সু মিষ্ট হয়ে উঠছে। এ কারণেই বর্তমান মুহূর্তটা হয়ত আগের চেয়ে কিছুটা অন্যরকম।

একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ। ভারতীয় কূটনৈতিক পোস্টিং অনুসারে এটি বেশ অস্বাভাবিক, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রতীকী। তাঁর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার আর পাঁচ জন কূটনীতিকদের থেকে ভিন্ন, ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গে গভীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, শিকড় এবং বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট আবেগীয় ও কৌশলগত জটিলতার সঙ্গে পরিচিত এবং সেই পরিচয় সাথে নিয়ে এসেছেন। সেই পটভূমি এখন অমূল্য এবং সময়োপযোগী প্রমাণিত হতে পারে।

কখনো কখনো কূটনীতির জন্য শুধু প্রটোকল ও নীতিপত্র নয়, রাজনৈতিক প্রবৃত্তি, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করার ক্ষমতাও প্রয়োজন হয়। একজন কূটনীতিক দলিল নিয়ে আলোচনা করতে পারেন, কিন্তু একজন রাজনীতিক-কূটনীতিক কখনো কখনো আস্থা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। ত্রিবেদীর বাংলা সংযোগ তাকে সেইসব কথোপকথনের সেতুবন্ধনে সাহায্য করতে পারে যা আগে আমলাতান্ত্রিক সতর্কতা ও রাজনৈতিক দ্বিধার মধ্যে আটকে ছিল।

নয়াদিল্লির একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ক্যারিয়ার ভিত্তিক কূটনীতিকের পরিবর্তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, ভারত বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশ- ভারত এর বর্তমান মুহূর্তটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কিন্তু কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ শুধু আরেকটি প্রতিবেশী দেশ নয় — পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সভ্যতাগত অংশীদার। ভূগোলই আন্তনির্ভরশীলতা নিশ্চিত করে। ইতিহাস তা গভীর করে, অর্থনীতি তা আরও শক্তিশালী করে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে শেখ হাসিনার সরকারের ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের নাটকীয় পতনের পরবর্তী অস্থিরতার পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রিসেট করার নতুন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। উভয় পক্ষের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সংকেতগুলো অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ও কৌশলগত অনিশ্চয়তার সময়ের পর ধীরে ধীরে বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারত ও বাংলাদেশের অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ ও সম্ভবনা আছে যে তারা সন্দেহের চক্রে আটকে থাকতে পারে না। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন — সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যখন রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়। তার চেয়েও বড় কথা, সীমান্তের দুই পাশের সাধারণ মানুষ যেটা বোঝে, রাজনীতিবিদরা মাঝে মাঝে ভুলে যান: নদী পাসপোর্ট চেনে না।

তাই তিস্তা বিরোধকে আর অসমাধানযোগ্য বলে দেখা উচিত নয়, বরং এটাকে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। পরিণত গণতন্ত্রগুলো কীভাবে আঞ্চলিক স্বার্থের সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক দায়িত্বের সমন্বয় করতে পারে তার দৃশ্যমান প্রমান প্রদর্শনের এটিই উপযুক্ত সময়।

দক্ষিণ এশিয়াবাসীরা প্রায়ই রসিকতা করে যে, আমাদের রাজনীতিবিদরা নির্বাচনী স্লোগান ছাড়া সবকিছু ভাগ করতে পারেন। কিন্তু তিস্তা ইস্যু হয়তো অবশেষে তার উল্টোটা প্রমাণ করবে: রাজনীতি যখন প্রতিযোগিতামূলকের পরিবর্তে সহযোগিতামূলক হয়, তখন পানিও ভাগ করা যায়।

একটি সফল তিস্তা চুক্তি উভয় দেশের জন্যই বড় মূল্যবান হবে। বাংলাদেশের জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি, তার ন্যায্য পানির অংশ। ভারতের জন্য এটি হবে দেশীয় জটিলতা সত্ত্বেও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী নির্ভরযোগ্য আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আর পশ্চিমবঙ্গের জন্য সেচ সুরক্ষা ও ঋতুভিত্তিক নমনীয়তা সম্বলিত একটি সুষম সূত্র কৃষি উদ্বেগ কমিয়ে সীমান্তের স্থিতিশীলতা জোরদার করতে পারে।

তবে পানি বণ্টন চুক্তি প্রায়ই বৃহত্তর আস্থা-নির্মাণের গতি সৃষ্টি করে। একবার আস্থা বাড়লে সহযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হয়। বাণিজ্য করিডোর, বিদ্যুৎ গ্রিড, পর্যটন, নদী পরিবহন থেকে শুরু করে জলবায়ু অভিযোজন পর্যন্ত। এমন এক সময়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার পানি ব্যবস্থাকে ক্রমশ হুমকির মুখে ফেলছে, তখন যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা আর ঐচ্ছিক নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। এখানে একটি গভীর রাজনৈতিক শিক্ষাও আছে।

বছরের পর বছর সমালোচকরা বলে এসেছেন যে, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিজেই আঞ্চলিক কূটনীতিকে সরল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসা করা কঠিন করে তোলে। তিস্তা অচলাবস্থা ছিল তার পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ। নয়াদিল্লি ও রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত কলকাতা সরকারের সমন্বয়ে ভবিষ্যতে তিস্তা চুক্তি হলে তা ২০১১ সালের পরিত্যক্ত কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল প্রমাণিত হতে পারে। নদী তো ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেই আছে।

ইতিহাস বলে, ভারত ও বাংলাদেশ সাধারণত অগ্রসর হয় যখন তারা অতীতের অভিযোগের পরিবর্তে সাধারণ স্বার্থ খুঁজে পায়। এই সম্পর্ক রাজনৈতিক পরিবর্তন, সীমান্ত উত্তেজনা, অভিবাসন বিতর্ক ও মতাদর্শগত পরিবর্তন সত্ত্বেও টিকে আছে, কারণ ভূগোল ও সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত বাস্তবতা সাময়িক অস্থিরতার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তাই এই মুহূর্তটি সতর্ক আশাবাদের দাবি রাখে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন বিএনপি সরকার দ্বিপাক্ষিক আস্থা পুনঃস্থাপনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সবগুলো উপাদান মিলে ২০১১ সালের ব্যর্থ চুক্তির পর থেকে অগ্রগতির জন্য সম্ভবত সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তিস্তা বিরোধ অনেকদিন ধরে সুযোগ হাতছাড়া করার রূপক হয়ে আছে। কিন্তু আমরা যেন না ভুলি, নদীগুলো নবায়নেরও প্রতীক। আর হয়তো বছরের পর বছর কূটনৈতিক খরার পর তিস্তার পানি অবশেষে আবার নিচের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করবে, বিভেদের দিকে নয়, বোঝাপড়ার দিকে।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman