লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

গাজা থেকে ইয়েমেন থেকে ইরান, প্রতিরোধের নির্ভীক কণ্ঠস্বর

প্রকাশিত: 02 এপ্রিল 2026

10 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন যতটা শক্তিশালী, তার চেয়ে কম নয় একটি শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠস্বর। যখন ধ্বংসস্তূপের মাঝে একজন মানুষ মুখোশের আড়াল থেকে কথা বলেন, আর সেই কণ্ঠস্বর লাখো লাখো মানুষের বুকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, তখন বোঝা যায় যুদ্ধ আর শুধু অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, তা হয়ে উঠেছে আত্মমর্যাদার যুদ্ধ, মনোবলের যুদ্ধ, আশার যুদ্ধ।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সামরিক মুখপাত্ররা আর শুধু তথ্য দিচ্ছেন না। তাঁরা হয়ে উঠেছেন জাতির আশা, প্রতিরোধের প্রতীক এবং লাখো মানুষের অদৃশ্য ঢাল। সবার আগে যাঁর নাম উঠে আসে, তিনি আবু উবায়দা। হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসসাম ব্রিগেডের এই মুখপাত্রের চেহারা আমরা দেখিনি, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর মুক্তিপাগল কোটি হৃদয়ে গেঁথে গেছে। কালো কেফিয়ার আড়ালে লুকানো মুখ, কিন্তু চোখ দুটো যেন আগুনের শিখা। তিনি যখন কথা বলেন, তাঁর বক্তব্যের শুরু হয় মহান স্রষ্টা আল্লাহকে স্মরণ করে, তাঁর গলায় কোনো কাঁপুনি থাকে না। শান্ত, গম্ভীর, কিন্তু অসম্ভব শক্তিশালী। প্রতিটি বাক্যের শেষে তাঁর কণ্ঠস্বর একটু উঁচু হয়, আর সেই মুহূর্তে গাজার ধ্বংসস্তূপে বসে থাকা মানুষের চোখে আশার আলো জ্বলে ওঠে, নিপীড়ণের শৃঙ্খল মুক্ত হতে আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয় প্রতিটি হৃদয়। ক্ষুধা, মৃত্যুভয় ভুলে গিয়ে আরো আরো শক্ত হয় প্রতিরোধের প্রতিজ্ঞা।

“আমাদের রক্ত ঝরছে, কিন্তু আমাদের ইচ্ছাশক্তি ভাঙেনি”, এই একটি বাক্য যখন তিনি বলেন, তখন বিধ্বস্ত বাড়ির ছাদের নিচে লুকিয়ে থাকা শিশুরাও মাথা উঁচু করে। আবু উবায়দা শুধু খবর দেন না, তিনি ক্ষতবিক্ষত জাতিকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি তাদের বলেন, তোমরা একা নও। আমরা আছি। আমরা দেখছি। আমরা লড়ছি। তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে গাজার প্রতিটি মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখের ভাষা, প্রতিটি শহীদের অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতিধ্বনি, প্রতিটি বন্দী ফিলিস্তিনির মুক্তির স্বপ্ন।

একইভাবে ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারিও জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। প্রতিটি বক্তব্য তিনি কুরআনের আয়াত দিয়ে শুরু করেন। “ক্বালা তা’আলা” বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কণ্ঠে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তি ফুটে ওঠে। তাঁর শান্ত, স্পষ্ট ও দৃঢ় উচ্চারণ শুনে মনে হয়, এই মানুষটি শুধু যুদ্ধের খবর দিচ্ছেন না, তিনি তাঁর জাতিকে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত করে দিচ্ছেন। যখন তিনি বলেন, “আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, আমাদের জনগণও প্রস্তুত”, তখন ইয়েমেনের পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষও নিজেকে অপরাজেয় মনে করে।

আর বর্তমান ইরানি সংঘাতে ইবরাহিম জুলফাগারিও একইভাবে জনমনে আস্থা তৈরি করছেন। “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” দিয়ে শুরু করা তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে ফার্সি উচ্চারণ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। তাঁর শান্ত কিন্তু অটল কণ্ঠস্বর, সামরিক পোশাক এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, ইরান একা নয়। তার পিছনে একটি অটুট, গর্বিত জাতি দাঁড়িয়ে আছে।

এই তিনজন মুখপাত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তাঁরা জনগণকে শুধু সত্য বলেন না, তাঁরা তাদের আশ্বস্ত করেন। তাঁরা বলেন, “আমরা দেখছি। আমরা শুনছি। আমরা প্রতিরোধ করছি, বিজয় আমাদের দ্বারপ্রান্তে, শুধু একটু ধৈর্য্য দরকার আমাদের।” এই বাক্য গুলোই লাখো মানুষের ভাঙা মনকে আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়, অনুপ্রেরণা যোগায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের।

ডিজিটাল যুগে যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তথ্যযুদ্ধ, মনোবলের যুদ্ধ এবং জনমত গঠনের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে আবু উবায়দা, ইয়াহইয়া সারি ও ইবরাহিম জুলফাগারি হয়ে উঠেছেন আসল নায়ক। তাঁরা প্রমাণ করেছেন একজন সত্যিকারের মুখপাত্র যখন জনগণের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর কণ্ঠস্বরই হয়ে ওঠে লাখো মানুষের সাহস ও আশার প্রতীক। তাঁরা শুধু যুদ্ধের খবর দেন না, তাঁরা একটি জাতিকে আত্মমর্যাদাবোধে জাগিয়ে তোলেন।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman