দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের ভুলে না যাওয়ার বার্তা নিয়ে সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন তিন বাংলাদেশি অদম্য অকুতোভয় সৈনিক। ঢাকার দৃকপাঠ ভবনে আয়োজিত ‘ফ্লোটিল্লা: বাংলাদেশ গাজার জন্য পাল তোলে‘ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় মোহাম্মদ আলী লিয়াকত, জুবায়ের ইসলাম খান ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম তাঁদের সেই যাত্রা, আটক হওয়ার অভিজ্ঞতা, ভয়, বিশ্বাস ও সংহতির কথা তুলে ধরেন। এসময় দৃক্পাঠ ভবনে তাদের এই মানবিক অথচ দুঃসাহসী অভিযানের আলোকচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
আলোচনায় মোহাম্মদ আলী লিয়াকত বলেন, গাজায় হামলা চলতে থাকার সময় শুধু প্রতিবাদ ও আবেদন যথেষ্ট মনে হয়নি তাঁর কাছে। ইসলামী বিশ্বাস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নেওয়ার তাগিদ থেকেই তিনি ফ্লোটিলায় যুক্ত হন। যাচাই-বাছাইয়ের পর তিনি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল গঠনে সহায়তা করেন।

পরিবারকে সিদ্ধান্তের কথা জানানো সহজ ছিল না। বিশেষ করে মাকে জানানো কঠিন হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মা বাধা দেননি। বরং যাত্রার জন্য অর্থ দিয়ে ছেলেকে উৎসাহিত করেন। লিয়াকতের ভাষায়, মায়ের সেই সমর্থন তাঁর সংকল্প আরও দৃঢ় করে।
ফ্লোটিলার সদস্যরা আটকের সম্ভাবনা মাথায় রেখে কঠোর প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে জাহাজ, ক্রু, ওষুধ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুত করার পাশাপাশি আটক ও নির্যাতনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনুশীলন করা হয়। লিয়াকত বলেন, এই যাত্রা ব্যক্তিগত বীরত্ব প্রদর্শনের বিষয় নয়। এর কেন্দ্রে থাকা উচিত ফিলিস্তিনের মানুষ।
জুবায়ের ইসলাম খানের কাছে গাজার পরিস্থিতি একসময় অসহায়ত্ব থেকে অপরাধবোধে রূপ নেয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসের কারণে তাঁর মনে হতো নিজের দৈনন্দিন জীবন, কর ও ভোগের মাধ্যমে তিনি এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যা এই ধরণের সংঘাতকে টিকিয়ে রাখছে। পরে মসজিদে লিয়াকতের গাজা অভিযানের কথা শুনে স্ত্রীকে জানান এবং ইস্তিখারা নামাজ আদায়ের মদ্ধ দিয়ে ফ্লোটিলায় যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সমুদ্রযাত্রার সময় বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের একসঙ্গে পথ চলা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এক রাতে জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হলে তারার অবস্থান দেখে দিক নির্ধারণের অভিজ্ঞতাকেও তিনি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি হিসেবে বর্ণনা করেন। সে সময় তার মনে পরে যায় পবিত্র কোরানের সূরা আল আনাম এর সেই আয়াত “তিনিই তোমাদের জন্য তারকামণ্ডলী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে তাদের মাধ্যমে পথপ্রদর্শন লাভ করতে পার। আমরা জ্ঞানী লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছি।” (৬:৯৭)

যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা জুবায়ের আটকের সময় সরাসরি সম্প্রচার চালানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী তাঁকে আটক করে তাঁর ক্যামেরা ভেঙে দেয়। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য তিনি নিজের মুঠোফোন (মোবাইল ফোন) সমুদ্রে ফেলে দেন। আটক অবস্থায় মারধর, বিবস্ত্র করা ও যৌন নিপীড়নের গুরুতর অপরাধগুলো করতেও ইসরাইলি বাহিনী পিছপা হয়নি।
আলোচনায় শহিদুল আলম বলেন, বাংলাদেশি তিনজন আলাদা জাহাজে ছিলেন। তাঁর জাহাজ ‘কনশিয়েন্সে’ প্রায় ৯০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মী। বিভিন্ন দেশের মানুষের অংশগ্রহণে গঠিত এই যাত্রার উদ্দেশ্য শুধু ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া ছিল না। গাজার মানুষের প্রতি আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ এবং অবরোধের দিকে বিশ্বের দৃষ্টি ফেরানোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
শহিদুল জানান, তিনি বাংলাদেশের পতাকা সঙ্গে নিয়ে জাহাজে ওঠেন। জাহাজে জীবন ছিল কঠিন ও নিয়ন্ত্রিত। রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং সীমিত ঘুমের জায়গা সবাইকে ভাগ করে নিতে হয়েছে। তিনি আকাশপথে নজরদারি ও জাহাজের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণেও অংশ নেন।

২০২৫ সালের ওই অভিযানে ‘কনশিয়েন্স’সহ ফ্লোটিলার কয়েকটি জাহাজকে ইসরায়েলি বাহিনী আটক করে। শহিদুল আলমকে আটকের পর তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনেও তাঁর আটকের বিষয়টি ওই সময়ে আলোচিত ছিল।
তিন আলোচকের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও তাঁদের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একই বার্তা। গাজার মানুষের প্রতি সংহতি শুধু সহানুভূতি প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাঁদের মতে, ফ্লোটিলার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের জানানো যে বিশ্বের মানুষ তাঁদের ভুলে যায়নি।
শহিদুল আলম বলেন, মিশন বাধাগ্রস্ত হলেও এর রাজনৈতিক ও মানবিক বার্তা থেমে যায়নি। বরং জাহাজ আটক হওয়ার ঘটনাই গাজার পরিস্থিতির দিকে নতুন করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
