দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । মোঃ বুলবুল ভূঁইয়া ।
বাচ্চা মেয়েটার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনে ওঠার আগেই তাকে বিদায় নিতে হলো এমন এক নির্মম বাস্তবতার মধ্যে, যেখানে অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে “বিচারহীনতা”। কয়েকদিন পর হয়তো আমরা আরেকটি নাম শুনবো। আরেকটি ছোট্ট মুখ সংবাদ শিরোনামে আসবে। সামাজিক মাধ্যমে আমরা আবার ক্ষোভে ফুঁসে উঠবে, মানববন্ধন হবে, কিছুদিন আলোচনা চলবে, তারপর সব ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে নীরবতার অতল অন্ধকারে।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর সংকটগুলোর একটি হচ্ছে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি। হত্যা, ধর্ষণ, গুম, নির্যাতন কিংবা শিশু হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের পরও জামিনে মুক্ত হয়, মুক্তি পায়, রায় কার্যকর হয়না বছরের পর বছর ধরে। অসংখ্য পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থেকেছে। অনেক মামলার তদন্ত শেষ হয়নি, অনেক মামলার সাক্ষী হারিয়ে গেছে, আবার অনেক মামলায় রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার বলয় কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতা সত্যকে চাপা দিয়েছে।
এই দেশে তনু হত্যাকাণ্ড আজও মানুষের মনে ক্ষত হয়ে আছে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পুরো দেশ নড়ে উঠেছিল। লাখো মানুষ বিচার চেয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর সেই মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। একইভাবে আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলাও এক দশকের বেশি সময় পেরিয়েও কোর্ট শুধু তারিখের পর তারিখ দিয়ে যাচ্ছে। শিশু সামিউল, নুসরাত, আবরার, বিশ্বজিৎ কিংবা অসংখ্য নামহীন ভুক্তভোগীর পরিবার এখনও এক ধরনের দীর্ঘ মানসিক কারাবাসে জীবন কাটাচ্ছে। মামলার রায় হয়েছে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না, কেন?
সবচেয়ে নিদারুন ও করুন বাস্তবতা হলো, এসব ঘটনায় শুধু একজন মানুষ মারা যায় না, ধীরে ধীরে মরে যায় আইন, বিচার ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা। যখন অপরাধী বুঝে যায় যে, অপরাধের আলোচনা ফিকে হয়ে আসলেই এবং সময় পার হলেই ঘটনা চাপা পড়ে যাবে সব, তখন অপরাধ আরও সাহসী হয়ে ওঠে, জন্ম হয় আরো নতুন অপরাধীর। বিচারহীনতা তখন আর কেবল একটি ব্যর্থতা থাকে না, এটি নতুন অপরাধের জন্মদাতা হয়ে দাঁড়ায়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার চাওয়া প্রতিশোধ নয়, বরং এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, স্বজন হারানো পরিবারকেই বছরের পর বছর আদালত, তদন্ত আর প্রশাসনিক জটিলতার পেছনে ঘুরতে হয়। একসময় তারা ক্লান্ত হয়ে যায়, সমাজ ভুলে যায়, রাষ্ট্র নীরব হয়ে পড়ে। অথচ অপরাধীরা ঠিকই বুঝে যায় যে এই নীরবতাই তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনায় নতুন করে আশার আলোও দেখা যাচ্ছে। বহু আলোচিত তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি পুনরায় আলোচনায় এসেছে এবং বিচার প্রক্রিয়া এগোনোর খবর সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর অধীনে অন্তত কিছু পুরোনো মামলার গতি ফিরে পাওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও শুধুমাত্র একটি বা দুটি মামলার অগ্রগতি দিয়ে পুরো বিচারব্যবস্থার সংকট দূর হবে না, তবুও মানুষ এখন অন্তত দেখতে চায় যে রাষ্ট্র সত্যিই অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় কি না।
কারণ, বিচারহীনতা বন্ধ না হলে রামিসা হারিয়ে যাবে, নতুন তনু হারিয়ে যাবে, নতুন কোনো পরিবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শুধু অপেক্ষা করবে। আর আমরা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে আবারও পরের ঘটনার অপেক্ষায় থাকবো। আমি রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা করি ঠিক এখনই বিচারহীনতা, আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতা মুক্ত পদক্ষেপ নেবে। আমি, আমরা সাধারণ মানুষ আইনের মার-প্যাচ আমরা বুঝিনা, বুঝতেও চাইনা। আমরা চাই প্রতিটা অপরাধের বিচার হবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই হবে।
বাংলাদেশের মানুষ প্রতিহিংসা চায় না। মানুষ চায় আইনের শাসন। চায় এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধটাই বিচার নির্ধারণ করবে। যেখানে একটি শিশুর জীবন, মানুষের সম্মান, সামাজিক নিরাপত্তা যে কোনো রাজনৈতিক হিসাবের চেয়ে মূল্যবান হবে। যেখানে একজন মায়ের কান্না বছরের পর বছর আদালতের সিঁড়িতে আটকে থাকবে না।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার ন্যায়বিচারে। আর সেই ন্যায়বিচার যতদিন দৃশ্যমান না হবে, ততদিন এই সমাজ নিরাপদ হবে না।
