লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ইমরান খানের মৃত্যু: গুজব না সত্য? ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা

প্রকাশিত: 27 নভেম্বর 2025

29 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মৃত্যুর গুজব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। আদিয়ালা জেলে খুন হওয়ার অভিযোগ উঠতেই তার বোনেরা জেলের সামনে আন্দোলন করে এবং সহস্রাধিক সমর্থক জড়ো হয়। কিন্তু সত্য কী? পাকিস্তান সরকার ও জেল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে বলেছে, ইমরান খান জীবিত এবং সুস্থ আছেন। এই গুজবের উৎস ভারতীয় গণমাধ্যমের সন্দেহজনক প্রচারণা। এর পেছনে ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী তা সময়ই বলে দেবে।

এই ধরণের ছড়িয়ে পরা খবরের সূত্রপাত ভারতীয় গণমাধ্যম এবং পরে সামাজিক যোগাযোগ মাদ্ধমে। ২৫ নভেম্বর (২০২৫) সকাল থেকে ভারতীয় খবরের বেশ কিছু চ্যানেলে ছড়াতে শুরু করে, ইমরান খান আদিয়ালা জেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক খুন হয়েছেন। আফগানিস্তানভিত্তিক ‘আফগান টাইমস’-এর একটি অযাচাইকৃত পোস্টকে ভিত্তি করে ইন্ডিয়া টুডে, ইকোনমিক টাইমস, ইন্ডিয়া টিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া সহ একাধিক চ্যানেল এই খবর প্রচার করে। কিছু চ্যানেল শিরোনাম দিয়েছে: “ইমরান খান খুন? আদিয়ালা জেলে মৃত্যু”। এমনকি বালুচিস্তানের ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রি’-র একটি অযাচাইকৃত টুইটও ছড়িয়ে পড়ে, যাতে বলা হয়েছে খানকে আইএসআই কর্তৃক হত্যা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজিজ নাজির তানোলি ২৬ নভেম্বর স্পষ্ট করে বলেছেন, “ইমরান খান জীবিত এবং সুস্থ আছেন। এসব গুজব সম্পূর্ণ মিথ্যা।” আদিয়ালা জেল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, খান জেলে আছেন এবং তার স্বাস্থ্য স্বাভাবিক। এই গুজবের ফলে খানের বোনরা (নুরিন, আলিমা ও উজমা খান) জেলের সামনে আন্দোলন করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পিটিআই সমর্থকরা জেল আক্রমণের চেষ্টা করে, কিন্তু পরে শান্ত হয়।

এক্স (টুইটার)-এ #ইমরানখান ট্রেন্ড হয় এবং লক্ষাধিক পোস্ট হয়। পাকিস্তানি ও আফগান হ্যান্ডেলগুলো ভিডিও শেয়ার করে, যা আসলে পুরনো ফুটেজ (যেমন ২০১৩ সালের খানের র‍্যালিতে আহত হওয়ার ভিডিও)। এতে পাকিস্তানে উত্তেজনা বাড়ে এবং সরকার কিছুটা চাপে পরে। ফ্যাক্ট-চেকাররা (যেমন আল্ট নিউজ) বলেছে, এই গুজব ভারতীয় মিডিয়া থেকে শুরু হয়েছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের এই ধরনের সন্দেহজনক প্রচারণা নতুন নয়। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় (যেমন ২০১৯ পুলওয়ামা বা ২০২৫ কাশ্মীর সংঘর্ষে) এরা বারবার অযাচাইকৃত খবর ছড়ায়। উদাহরণ, ২০১৯-এ ভারতীয় চ্যানেলগুলো দাবি করে যে ইসলামাবাদ দখল হয়েছে বা কারাচি বন্দর ধ্বংস হয়েছে, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এবার খানের মৃত্যু গুজবও আফগান টাইমসের অযাচাইকৃত পোস্টকে ভিত্তি করে ছড়ানো হয়েছে, কিন্তু চ্যানেলগুলো কোনো ডিসক্লেইমার ছাড়াই হেডলাইন বানিয়েছে।

ভারতীয় মিডিয়ার বিশ্বব্যাপী বদনাম আছে ভুল সংবাদ প্রচারের জন্য। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ২০২৫-এর প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতকে ১৫৯তম স্থান দিয়েছে, কারণ এখানে মিডিয়া রাজনৈতিক চাপে ‘প্রোপাগান্ডা’ করে। ইউ ডিসইনফোল্যাবের ২০২০ রিপোর্টে দেখা গেছে, ভারত ৭৫০টির বেশি ফেক মিডিয়া সাইট তৈরি করে পাকিস্তান-চীনকে বদনাম করে।

ভারতীয় মিডিয়ার এই প্রচারণার পেছনে রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। যেমনঃ জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট জাগানো। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় (যেমন কাশ্মীর ইস্যুতে) এমন খবর জনগণের মধ্যে ‘পাকিস্তান-বিরোধী’ মেজাজ তৈরি করে। এটি মোদি সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ায়। পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টাও থাকতে পারে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। ইমরান খান পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা এবং আইএসআই-সেনাবাহিনীর অনেক কাজের সাথেই এক মত নন। তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরি করা যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও জনতাকে মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে ভারত কৌশলগত সুবিধা আদায় করতে পারে।

ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার: ইউডিসইনফোল্যাব রিপোর্ট অনুসারে, ভারত ১১৬ দেশে ফেক মিডিয়া তৈরি করে প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। এটি পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ইমেজ নষ্ট করে এবং ভারতকে ‘শক্তিশালী’ হিসাবে বিশ্বের সামনে নিয়ে আসে। ইমরান খান যেহেতু ভীষণ জনপ্রিয় নেতা তাই এমন খবর পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ায় এবং ভারতের সামরিক প্রস্তুতির অজুহাত দেয়।

ভারতীয় ফ্যাক্ট-চেকার আল্ট নিউজের মতে, এই প্রচারণা ‘জাতীয়তাবাদী ইমোশন’কে লক্ষ্য করে এবং সত্যের চেয়ে রেটিংসকে প্রাধান্য দেয়। ন্তর্জাতিকভাবে এটি ভারতের মিডিয়াকে ‘প্রোপাগান্ডা টুল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পাকিস্তান সরকার, জেল কর্তৃপক্ষ এবং পিটিআই নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, ইমরান খান জীবিত। তার বোন আলিমা খানও জানিয়েছেন, তারা খানের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি বলে চিন্তিত, কিন্তু মৃত্যুর কোনো প্রমাণ নেই। এই গুজব পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরি করলেও, সত্যতা যাচাইয়ে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

ভারতীয় মিডিয়ার এই প্রবণতা দেশটির একটি নিদৃষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ হাসিলের অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ইমেজের জন্য ক্ষতিকারক। বিশ্বব্যাপী এটি ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ এর উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে প্রত্যুত্তর হিসেবে ফেক নিউজ ছড়ানোর প্রবণতা খুবই কম হলেও এই ধরণের ঘটনা উভয়পক্ষের উত্তেজনা ও ঘৃণা বাড়ায়।

 

 

 

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, ইকোনমিক টাইমস, ইন্ডিয়া টিভি, আউটলুক ইন্ডিয়া, বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, ইউ ডিসইনফোল্যাব।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman