দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরুর পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটিতে থাকা মার্কিন সেনাদের শেষ দলও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত সময়সীমার এক দিন আগেই শেষ মার্কিন সেনারা ইরাকের শেষ ঘাঁটিগুলো ছেড়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।
ইরাকের জন্য ঘটনাটি একই সঙ্গে সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাগদাদ সরকার বলছে, বিদেশি সেনাদের বিদায়ের পর দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি ইরাকি বাহিনীর হাতে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী আলী আল জাইদির কার্যালয় জানিয়েছে, ১ অক্টোবর থেকে ইরাক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে এবং বিদেশি সামরিক উপস্থিতি ছাড়াই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো পরিচালিত হবে।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু হয়। একপর্যায়ে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি হয়েছিল। ২০১১ সালে মার্কিন যুদ্ধসেনাদের শেষ বড় দল ইরাক ছাড়ে। তবে ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করলে জঙ্গিবিরোধী আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে মার্কিন সেনারা আবার ইরাকে ফিরে আসে।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন ও ইরাকি সরকার সেনা উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়। ২০২৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করার পাশাপাশি অবশিষ্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। গত বছর ইরাকের অধিকাংশ এলাকা থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া হলেও উত্তরাঞ্চলের কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত এলাকায় সীমিত উপস্থিতি বজায় ছিল।
শেষ ধাপে বাগদাদ ও কুর্দি অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে সাবেক ক্যাম্প ভিক্টরি এলাকা থেকে মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমান চলে যাওয়ার দৃশ্য প্রত্যাহারের শেষ পর্যায়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে মার্কিন সেনাদের বিদায়কে ঘিরে ইরাকে স্বস্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের ঘুমন্ত নেটওয়ার্কগুলোও নতুন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
বিশেষ করে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী কতটা স্বাধীনভাবে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতদিন মার্কিন বাহিনী ইরাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে গোয়েন্দা সহায়তা, নজরদারি ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে এসেছে।
এর পাশাপাশি ইরাকের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দেশের সব অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ সফল না হলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তৈরি হওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের অর্থ ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সম্পর্কের অবসান নয়। সামরিক উপস্থিতি শেষ হলেও কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার কিছু কাঠামো বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ওয়াশিংটন ও বাগদাদ ইতিমধ্যে তাদের সম্পর্ককে সামরিক সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ইরাকের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বিদেশি সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরতা ছাড়াই দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ধরে রাখা। একই সঙ্গে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী, ইসলামিক স্টেটের সম্ভাব্য পুনরুত্থান এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব সামাল দেওয়াও বাগদাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
