দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । সাকিব আহমেদ ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবেগ সবসময়ই একটি শক্তিশালী অস্ত্র। কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কখনো ধর্ম, কখনো জাতীয়তাবাদ— আর এখন সেই আবেগের নতুন উপকরণ হয়ে উঠছে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা।
৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও দলটিকে ঘিরে থাকা নানান আবেগ-রাজনীতির পুনরুত্থানের চেষ্টা যেভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে, সেখানে হঠাৎ করেই “মাশরাফি প্রযোজনা” সামনে আসার বিষয়টিকে অনেকে নিছক কাকতালীয় বলে মনে করছেন না। বরং এটিকে একটি বৃহত্তর “সিম্প্যাথি ইঞ্জিনিয়ারিং”-এর অংশ হিসেবেই দেখছেন।
বাংলাদেশে এমন একজন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি কোনো না কোনো সময় মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে মুগ্ধ হননি। ক্রিকেট মাঠে তাঁর লড়াকু মনোভাব, ইনজুরি নিয়েও খেলে যাওয়া, দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া— সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন “নেশনস ক্যাপ্টেন”। মাশরাফির প্রতি মানুষের ভালোবাসা শুধুই ক্রিকেটীয় ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর সরলতা, মানবিকতা এবং দেশপ্রেমিক ইমেজ।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একজন জাতীয় নায়ক নিজেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেন। ক্রিকেট মাঠের “সবার মাশরাফি” ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একটি দলের প্রতিনিধি। বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর একটিতে অংশ নেওয়ার পর থেকেই তাঁর ইমেজে প্রথম বড় ফাটল দেখা দেয়। কারণ মানুষ তাঁকে শুধু একজন এমপি হিসেবে দেখেনি; দেখেছে একজন জাতীয় প্রতীকের রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে।
এরপর আসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তাল সময়গুলোর একটিতে, যখন তরুণ থেকে বৃদ্ধ— সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন সাধারণ মানুষ তাদের জাতীয় আইকনদের কাছ থেকে অন্তত একটি নৈতিক অবস্থান প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সেই সময় মাশরাফি, সাকিব কিংবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য জনপ্রিয় মুখগুলোর নীরবতা বহু মানুষের কাছে গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন— একজন জনপ্রিয় ক্রিকেটার কি শুধুই নিজের ক্যারিয়ার ও নিরাপত্তা নিয়ে ভাববেন, নাকি দেশের সংকটময় মুহূর্তে নৈতিক অবস্থানও নেবেন? এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এটাও সত্য যে জাতীয় আবেগের জায়গায় উঠে আসা মানুষদের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।
এখানেই “যদি” এবং “কিন্তু” শব্দ দুটি মাশরাফির সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে যায়। তাঁর ক্রিকেটীয় অর্জন নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে, ক্ষোভ আছে, হতাশা আছে। বিশেষ করে যখন অভিযোগ ওঠে যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন দমনে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলো সক্রিয় ছিল, তখন জনগণের একাংশের কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়— জনপ্রিয় এমপি হিসেবে তিনি কি সত্যিই সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ছিলেন?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর হয়তো কখনোই পাওয়া যাবে না। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, জনমনে একবার সন্দেহ তৈরি হলে সেটি সহজে মুছে যায় না।
অন্যদিকে, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরও দলটির বিভিন্ন স্তরের সমর্থক ও সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলো নানাভাবে মাঠে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রচারণা, কোথাও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সামনে এনে “মানবিক ট্র্যাজেডি” তৈরি, কোথাও আবার বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে জনমনে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা— সব মিলিয়ে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা বহুবার দৃশ্যমান হয়েছে।
রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত বিভিন্ন সময় গুজব, হঠাৎ বিক্ষোভ, উসকানিমূলক প্রচারণা এবং সামাজিক মাধ্যমে সংগঠিত আবেগীয় ক্যাম্পেইন— এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছেন না দেশের মানুষ।
কিভাবেই বা দেখবে? ৫ই আগষ্টের পর আ.লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠন যেভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় বাধা দিয়েছিলো সেটা পর্যায়ক্রমে এখনো চলে আসছে। সরকারের ও জনগনের নানান দূর্বলতা কাজে লাগিয়ে দেশে অরাজকতার সৃষ্টি করতে চেয়েছে বারংবার, কখনো সংখ্যালঘু দের উপর নির্যাতন, কিংবা তাদের ধর্মীয় উপসনালয়গুলোতে হামলা। মানুষ কে বুঝাতে চায় একমাত্র আওয়ামিলীগই দেশের স্রষ্টাপ্রদত্ত অভিবাবক তারা ছাড়া এই দেশ পশুদের গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছিলো, হচ্ছে ও হবে।
এবং তারা তাদের এই অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, আওয়ামিলীগ এর ১৭ বছরের নাটকের পর এখন ছোট থেকে বড় যেকোন কিছু ঘটলেই প্রথমে যে নামটা আসে সেটা হলো এটা তে আওয়ামী সন্ত্রাস জড়িত কিনা। ইভেন রিসেন্টলি ঘটে যাওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ধর্ষন অপচেষ্টা ও সেই তালিকায় থেকেই যাচ্ছে।
যাহোক, মুল বিষয়ে ফিরে আসি, এই আলোচিত-সমালোচিত দলটার কতকগুলো অপচেষ্টার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো– রবীন্দ্রনাথ কার্ড, ছায়ানট কার্ড, সাকিব আল হাসান কার্ড ইত্যাদি।
দেশের জণগণ এখন বুঝে গেছে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা শক্তিগুলো সরাসরি সংগঠনিক শক্তি দেখাতে না পারলে বিকল্প পথ হিসেবে “সিম্প্যাথি পলিটিক্স” বেছে নেয়। আর এই রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে জনপ্রিয় মুখ।
এ কারণেই অনেকে মনে করছেন, হঠাৎ করে মাশরাফিকে ঘিরে আবেগঘন ভিডিও, করুণ সুর, অভিমানী বক্তব্য কিংবা “অবমূল্যায়িত হিরো” আখ্যান সামনে আনার পেছনে শুধুই মানবিক অনুভূতি কাজ করছে না। বরং এটি হতে পারে জনমত পুনর্গঠনের একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ— এটাই আমাদের শক্তি, আবার দুর্বলতাও। আমরা খুব দ্রুত কাউকে মাথায় তুলি, আবার খুব দ্রুত হতাশও হই। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সমালোচনামূলক বোধ। একজন মানুষের ভালো কাজের প্রশংসা করা এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করা— দুটি একসঙ্গে সম্ভব।
মাশরাফির ক্রিকেটীয় অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে, রাজনীতিতে প্রবেশের পর তিনি আর শুধুই একজন ক্রিকেটার ছিলেন না। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত তখন রাজনৈতিক অর্থ বহন করেছে।
সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিকে এমনভাবে পূজা করি যে তাঁর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাকেও উপেক্ষা করতে শুরু করি। অথচ গণতন্ত্রে কেউই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নন— তিনি যত বড় তারকাই হোন না কেন।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আবেগ আর বাস্তবতাকে আলাদা করতে শেখা। বিউগলের করুণ সুর, সিনেমাটিক ভিডিও কিংবা আবেগময় বক্তব্য দিয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংকটে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের ব্যবহার করে জনগণের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
তাই আজ প্রয়োজন অন্ধ ভালোবাসা নয়, সচেতন মূল্যায়ন। মাশরাফির বোলিং, নেতৃত্ব কিংবা সংগ্রামী জীবনকে শ্রদ্ধা করা যেতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা, বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সংকটকালে নীরবতা কিংবা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার প্রশ্নও তুলতে হবে।
কারণ গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো— আবেগের কাছে বিচারবোধ হারিয়ে ফেলা।
আর বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সেই ভুলের মূল্য বহুবার দিয়েছে।
