দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
সরকারি খাল পুনঃখননের পর সেগুলোকে ঘিরে কর্মসংস্থান, মাছ চাষ, হাঁস পালন, সামাজিক বনায়ন ও মৌসুমি সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ‘মডেল খাল’ কর্মসূচির আওতায় দেশের আট বিভাগের ২০টি খালকে পরীক্ষামূলকভাবে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে যুক্ত করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বজায় রেখে সেগুলোকে স্থানীয় মানুষের জীবিকা অর্জনের উৎসে পরিণত করা হবে। খালপাড়ে গাছ লাগানো, উপযুক্ত স্থানে সবজি চাষ, নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালন এবং দেশীয় মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্যও নির্দিষ্ট অংশ উন্মুক্ত রাখার কথা রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ধারণাপত্রে এসব পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কর্মসূচিটি সফল হলে সরকারি জলসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে খাল নির্বাচন, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতার ওপর।
সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে দেশের নদী, খাল ও জলাধার মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার পুনঃখনন ও খননের লক্ষ্য রয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে কৃষিতে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়গুলোও যুক্ত।
আট বিভাগে যেভাবে বাছাই হবে ২০টি খাল
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ থেকে তিনটি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে দুটি করে খাল নির্বাচন করা হবে। প্রতিটি খালের গড় দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার ধরে মোট প্রায় ৬০ কিলোমিটার খালকে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
আগে পুনঃখনন করা হয়েছে বলেই কোনো খাল স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত হবে না। সংশ্লিষ্ট জেলার প্রস্তাবগুলো যাচাই করে খালের অবস্থান, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত নথি, অবৈধ দখলের পরিস্থিতি, পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে চাষাবাদের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতাভুক্ত পরিবার, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন এমন দরিদ্র পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে তাঁদের নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।
খালে থাকবে পৃথক ব্যবহার অঞ্চল
খালের পানিপ্রবাহ, পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে কয়েকটি পৃথক অঞ্চলে এর ব্যবহার নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
খালের নির্দিষ্ট অংশ সাধারণ মানুষের গোসল, গৃহস্থালি কাজে পানি সংগ্রহ এবং গবাদিপশুর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। গভীর ও উপযুক্ত অংশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কারিগরি পরামর্শে দেশীয় মাছ চাষ ও নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালনের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। নৌযান চলাচলের উপযোগী খালে নৌচলাচলের পথও সংরক্ষণ করা হবে।
খালের দুই পাড়ে মাটি ক্ষয় ও ধসের ঝুঁকি কমাতে উপযোগী জলসহিষ্ণু ও ফলদ গাছ লাগানো হবে। পাশাপাশি পাড়ের ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগ রাখা হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশিত বাংলাদেশের একটি অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মাছ চাষ, কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির সমন্বয় গ্রামীণ পরিবারের আয় ও জীবিকার বৈচিত্র্য বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে সেই অভিজ্ঞতার ফলাফল সরাসরি প্রস্তাবিত মডেল খাল কর্মসূচির সম্ভাব্য সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। এতে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা, আয় সৃষ্টি ও খালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে এসব সমবায় ভূমিকা রাখবে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা সমবায়কে খাল, খালের পাড়ের জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামোর ওপর স্থায়ী মালিকানা দেওয়া হবে না। নির্ধারিত শর্ত মেনে সীমিত ও হস্তান্তর-অযোগ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, নারীদের জীবিকা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ধারণাপত্র অনুযায়ী, পৃথক বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ না করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। অর্থটি স্থায়ী অনুদান বা দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি হিসেবে নয়, ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রাথমিক সহায়তায় উৎপাদন শুরু হওয়ার পর সমবায়গুলো নিজেদের আয় থেকে পরিচালন ব্যয় বহন করবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মসূচির সার্বিক তদারকিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ১২ মাস কার্যক্রম পরিচালনার পর স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেশব্যাপী সম্প্রসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লালমনিরহাটে কর্মসূচিটির উদ্বোধন করবেন। তবে নির্ধারিত দিনে উদ্বোধন ও পরবর্তী বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব ব্যবস্থাপনায়
মডেল খাল কর্মসূচির বড় সম্ভাবনা হলো, পুনঃখননের পর খালগুলোকে পরিত্যক্ত বা অব্যবস্থাপিত অবস্থায় ফিরে যেতে না দিয়ে স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করা। এতে দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি জলসম্পদের রক্ষণাবেক্ষণেও স্থানীয়দের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
তবে খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ, পানির গুণগত মান রক্ষা এবং মাছ ও হাঁস পালনের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন হবে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলদারত্ব ফিরে এলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় পানিদূষণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং নদী-খাল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
