লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ইতিহাস বদলে দেওয়া প্রতিরোধ

প্রকাশিত: 13 মার্চ 2026

48 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান |

মধ্যপ্রাচ্য আজ আগুনে পুড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জোট ইরানের ওপর ন্যাক্কারজনক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান একা এই পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। ইসরাইলে ব্যাপক হামলা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা ধ্বংস করছে। লেবাননের হিজবুল্লাহও ইসরাইলে অব্যাহত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে ইসরাইল লেবাননের বেসামরিক এলাকা যেমন, ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতালে নির্বিচারে বোমা মেরে ধ্বংস করছে। এ ঘটনা সবারই জানা।

যুক্তরাষ্ট্র কেন এ যুদ্ধ করছে? এ যুদ্ধের কারণ কী? উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছেও এই প্রশ্নের  সদুত্তর নেই। মার্কিন জনগণের প্রায় ৮০ শতাংশ মনে করেন, এটি তাদের যুদ্ধ নয়। তারা যুদ্ধের কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। সামরিক বিশ্লেষকরা স্পষ্ট বলছেন, এটি আমেরিকার যুদ্ধ নয়, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত যুদ্ধ। পিছনে রয়েছে এপস্টাইন ফাইলের কলঙ্কিত অধ্যায়। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন ট্রাম্পকে ব্ল্যাকমেইল করে এই অন্যায় যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে।

ইসরাইলের স্বভাব ভুলে গেলে চলবে না। একজন প্রথিতযশা ইসরাইলি রাবাইয়ের বক্তব্য স্মরণ করা জরুরি, তিনি বলেছেন, “মুসলিম শিশু এবং মুসলিমদের পশু-পাখি হত্যা করাও পাপ নয়, বরং পুণ্য।” এমন মানসিকতার অধিকারী একটি রাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক বোমা রয়েছে। এরা বিশ্বশান্তির জন্য চরম হুমকি।

যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানের আর পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। এই ঐতিহাসিক সুযোগ হারালে শুধু ইরান নয়, উপসাগরীয় দেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশকেও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইসরাইল এমন নজির সৃষ্টি করবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে না সাহস করে।

ইরানকে এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এটাই সেই সুযোগ,  ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে তীব্র সাইবার ও নির্ভুল হামলা চালানো এবং প্রকল্পটিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়া, বিমানশক্তি নিষ্ক্রিয় করতে রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, রেডার ও যুদ্ধবিমান অকার্যকর করা, অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভাঙতে বন্দর, তেল শোধনাগার, প্রযুক্তি কেন্দ্র ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আঘাত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা। যাদের তথ্যের উপর ভর করে ইসরাইল অন্যের ক্ষতি সাধন করে সেই মোসাদের আঞ্চলিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলতে কাউন্টার-অপারেশন, তথ্য আদান-প্রদান ও মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।  কূটনৈতিকভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলা যে ইরান কারও জন্য হুমকি নয় এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া।

উপসাগরীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ মহড়া ও অর্থনৈতিক-সামরিক সহযোগিতা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলতে হবে। এবং পশ্চিমা বয়ান ভেঙে, আত্মসমর্পণমূলক নীতির বিরোধিতা করে নতুন নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হারানো সম্মানের বয়ান পুনঃবিনির্মাণ করার এটাই উপযুক্ত সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলর । ওআইসি বা নতুন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা। তথ্য, প্রযুক্তি, সংস্কৃতিক বিনিময় আরো জোরদার করা।

এসব পদক্ষেপ নিলে ইরান কৌশলগত বিজয় ও আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জন করতে পারে। যদি ইরান এই বহুমুখী কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা কমে যাবে এবং সেই সাথে আক্রমণাত্মক মনোভাবও, বিমানবাহিনী অকার্যকর, অর্থনৈতিক ধ্বস, মোসাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিলে ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব অনেকটাই কমে আসবে।  উপসাগরীয় ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী জোট গড়ে তোলে তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে যেতে পারে। এই বিজয় তখন আর শুধু ইরানের থাকবেনা হবে পুরো মদ্ধপ্রাচ্চের বিজয় ও পশ্চিমা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির উপায়।

আর ইরানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীদের আশ্বস্ত করে পশ্চিম-বিরোধী ঐক্যবদ্ধ ব্লক গড়ে তবে এটিই হবে নিজেদের খনিজ সম্পদের উপর নিজেদের পূর্ন কর্তৃত্ত অর্জনের সুযোগ। তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো আধিপত্যবাদের কালো ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারবে। এতে ইরানের শর্তে শান্তি আলোচনা, অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংজ্ঞায় মদ্ধপ্রাচ্চ্য নিজেই নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আবির্ভূত হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, এই সব পদক্ষেপের বিপদজনক দিকও রয়েছে। এতদিন যারা অন্যের সম্পদ লুট করে নিচ্ছিল তারা আরো আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে পারে যা ভীষণ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত বিমানশক্তি, সাইবার প্রতিরক্ষা ও পুরা পশ্চিমা জোট এক হয়ে প্রত্যাঘাতমূলক আক্রমণ চালাতে পারে। ইসরাইলের পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।  মার্কিন  ও ন্যাটো বিমান বহর ইরানকে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিয়ে বিপুল প্রাণহানি ও শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনৈতিক হামলা বিশ্ব তেলের দাম বাড়িয়ে নিষেধাজ্ঞা ডেকে আনতে পারে এবং ইরান-বিরোধী অবস্থানে থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও দূরে ঠেলে দিতে পারে। নতুন করে  সুন্নি-শিয়া বিভেদের পুরানো রাজনৈতিক চালে পুরো অঞ্চলটিতে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনাকে প্রবল করে তুলতে পারে।  কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মতো প্রক্সি জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত ইরান বিচ্ছিন্নতা, শাসন অস্থিরতা বা ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে, দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ব মন্দা ও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিও অনেকটাই বেড়ে যাবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিজেদের দিকে টেনে আনতে এবং ঝুঁকি এড়াতে বা কমাতে ইরান আঞ্চলিক দেশগুলোকে তেল-গ্যাস কেনায় বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে ছাড়কৃত মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও বার্টার ব্যবস্থা চালু করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে পারে।

বিশ্ব মানবতার স্বার্থে যদি এখনই ইসরাইলকে সীমিত করা না যায়, তবে পুরো বিশ্ব ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করবে। ইরানের এই প্রতিরোধ শুধু নিজের নয়—সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ও মানবতার প্রতিরোধ। এখনই সময় ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman