লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

শাপলা গণহত্যা: বাংলার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত অধ্যায়

প্রকাশিত: 05 মে 2026

48 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

২০১৩ সালের ৫ মে রাত। ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঘনায়মান অন্ধকার। হঠাৎ সব আলো নিভে যায়। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। মিডিয়া ব্ল্যাকআউট চলতে থাকে। তারপর শুরু হয় এক নারকীয় অভিযান। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’। হাজার হাজার নিরস্ত্র আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের উপর চলে নির্বিচারে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিচার্জ ও নির্যাতন। এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘শাপলা গণহত্যা’ নামে কলঙ্কিত হয়ে আছে।

সেই সময় শাহবাগে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামে একটি আন্দোলন চলছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হলেও এই মঞ্চ ধীরে ধীরে ইসলাম ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বিরুদ্ধে অশালীন, কুরুচিপূর্ণ আক্রমণকারী ব্লগারদের অভয়াশ্রম হয়ে ওঠে, এই ব্লগারদের অনেকেই গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বস্থানীয় ও সক্রিয় কর্মী ছিল। কিছু নাস্তিক ব্লগার নবীজির (সা.) পরিবার ও সাহাবীদের নিয়ে অশ্লীল ব্লগ লিখতে থাকে। আল্লাহ তা’আলাকে নিয়েও অবমাননাকর কথা লেখা হয়। ৯৫% মুসলিমের দেশে এমন আক্রমণ সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত করে।

এই আন্দোলনের আড়ালে একটি দুরভিসন্ধি কাজ করছিল বলে অনেকে মনে করেন। শাহবাগীদের কিছু অংশ ভারতীয় সেক্যুলার ও হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছিল। তারা ইসলামী ঐতিহ্য, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে পশ্চাৎপদ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছিল। এতে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ফুঁসে ওঠে। হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে আলেম সমাজ ও সাধারণ মানুষ ১৩ দফা দাবিতে মাঠে নামেন। প্রধান দাবি ছিল, নবী (সা.) ও আল্লাহর অবমাননাকারীদের শাস্তির জন্য ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন।

আওয়ামী লীগ সরকার শাহবাগ আন্দোলনকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে বিরোধীদের দমনের পরিবেশ তৈরি হয়। একই সময়ে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে ভয় দেখিয়ে দমন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

৫ মে সকাল থেকে হেফাজতের সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসেন। অনেক শিশু-কিশোরও তাদের সাথে ছিল। কেউ মাদ্রাসার ছাত্র, কেউ সাধারণ পরিবারের সন্তান। রাতে শাপলা চত্বরে হাজার হাজার মানুষ নামাজ আদায় করছিলেন, কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হঠাৎ আলো নিভিয়ে যৌথ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি চলতে থাকে অবিরাম। চোখে পড়ার মতো আলোর অভাবে অনেকে পালাতেও পারেননি।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুসারে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অন্তত ৫৮ জনের কথা বলে। হেফাজতে ইসলাম ৯৩ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে। অনেকের মতে সংখ্যা আরও বেশি। শিশু-কিশোরসহ নিরীহ মানুষ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান, লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারার চিত্রও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। লাশ গায়েব করার অভিযোগও উঠে। এই ঘটনা শুধু হত্যা নয়, ধর্মীয় অনুভূতির ওপর নৃশংস আঘাত।

ঘটনার পর সরকারি দলের লোকজন উল্টো মামলা দিয়ে হেফাজত নেতাকর্মীদের হয়রানি করে। কিন্তু ২০২৪ সালের পরিবর্তনের পর চিত্র পাল্টায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) শেখ হাসিনাসহ ২১-৩৩ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। তদন্ত চলছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে ঢাকায় অন্তত ৩২ জনের হত্যার প্রমাণ মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ন্যায়বিচারের আশা দেখা যাচ্ছে, যদিও পুরো সত্য উদঘাটন এখনও বাকি।

শাপলা চত্বর গণহত্যা শুধু একটি রাজনৈতিক দমন নয়, ধর্মপ্রাণ মানুষের আত্মার ওপর আঘাত। যারা ইসলামকে অবমাননা করে সংস্কৃতির নামে বিদেশি আগ্রাসন চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদকে রক্তে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। শিশু-কিশোরদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল শাপলা চত্বর। এই গণহত্যার ন্যায়বিচার না হলে জাতি হিসেবে আমরা কলঙ্কমুক্ত হতে পারব না। আলেম-ওলামা ও সাধারণ মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যেন ভবিষ্যতে আর কখনো এমন নৃশংসতা না ঘটে।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman