দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।
হিজরি ৬ষ্ঠ সালের জিলকদ মাস (৬২৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ)। মক্কা থেকে হিজরতের ৬ বছর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি সাহাবীদের নিয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ করছেন এবং উমরা পালন করছেন। এই স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইঙ্গিত।
রাসূল ﷺ ১৪০০-১৫০০ সাহাবী (কেউ বলেন ১৩৯৪ জন) নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে রওয়ানা হন। তাঁরা ইহরাম বেঁধে, কোরবানির পশু (৭০টি উট) সঙ্গে নিয়ে যান। যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল না বলে অস্ত্র বলতে শুধু খাপবন্দি তলোয়ার নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল শান্তিপূর্ণভাবে কাবা জিয়ারত করা এবং কুরাইশদের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো।
কুরাইশরা এ খবর পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য পাঠায় এবং মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মুসলিমদের “আক্রমণকারী” বলে প্রচার করে। রাসূল ﷺ বিকল্প পথে এগিয়ে হুদায়বিয়ায় (মক্কা থেকে প্রায় ৯ মাইল দূরে, একটি কূয়াসহ প্রান্তর) তাঁবু ফেলেন।
কোথায় ও কীভাবে সন্ধি হয়েছিল (বিস্তারিত ঘটনাক্রম)
স্থান: আল–হুদায়বিয়া — মক্কার পবিত্র সীমানার ঠিক বাইরে, একটি গাছের নিচে।
ঘটনাক্রম:
- কুরাইশ প্রথমে বুদায়ল ইবনে ওয়ারকা ও মিকরাজকে দূত পাঠায়।
- রাসূল ﷺ হযরত উসমান (রা.)-কে মক্কায় পাঠান শান্তির বার্তা দিয়ে। কিন্তু তাঁর দেরি হওয়ায় গুজব ছড়ায় যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
- এতে সাহাবীরা ক্ষুব্ধ হয়ে বাইয়াতুর রিদওয়ান (গাছতলার শপথ) করেন — “আমরা মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করব”।
- পরে জানা যায় উসমান (রা.) জীবিত। কুরাইশ শেষ পর্যন্ত সুহাইল ইবনে আমরকে প্রতিনিধি করে পাঠায়।
- দীর্ঘ আলোচনার পর চুক্তি সম্পাদিত হয়। হযরত আলী (রা.) চুক্তিপত্র লেখেন।
- সুহাইল আপত্তি করে “রাসূলুল্লাহ” শব্দ কাটতে বলে — “আমরা তোমাকে রাসূল মানি না”। রাসূল ﷺ নিজ হাতে কেটে “মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ” লিখতে বলেন।
- চুক্তি স্বাক্ষরের পর সুহাইলের ছেলে আবু জান্দাল (রা.) (যিনি মুসলমান হয়ে পালিয়ে এসেছিলেন) এসে পড়েন। চুক্তির শর্ত অনুসারে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হয় — এতে সাহাবীরা আরও ক্ষুব্ধ হন।
- রাসূল ﷺ সাহাবীদের বলেন পশু কোরবানি করতে ও মাথা মুণ্ডন করতে (যেন উমরা সম্পন্ন হয়েছে)। সাহাবীরা প্রথমে দ্বিধায় পড়েন, কিন্তু রাসূল ﷺ নিজে করলে সবাই করেন।
- ২০ দিন হুদায়বিয়ায় থেকে মুসলমানরা মদিনায় ফিরে যান। ফেরার পথে সূরা আল–ফাতহ নাজিল হয়।
সন্ধির শর্তসমূহ
১. দুই পক্ষের মধ্যে ১০ বছরের যুদ্ধবিরতি (কোনো আক্রমণ হবে না)। ২. এ বছর মুসলমানরা উমরা না করে মদিনায় ফিরে যাবে। ৩. পরের বছর (৭ম হিজরি) মুসলমানরা ৩ দিনের জন্য মক্কায় প্রবেশ করে উমরা পালন করতে পারবে। কুরাইশরা তখন মক্কা ছেড়ে যাবে। মুসলমানরা শুধু খাপবন্দি তলোয়ার নিয়ে আসতে পারবে, অন্য কোনো অস্ত্র নয়। ৪. কুরাইশদের কেউ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদিনায় এলে (মুসলমান হয়ে) রাসূল ﷺ তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। ৫. মুসলমানদের কেউ মক্কায় চলে গেলে কুরাইশ তাকে ফিরিয়ে দেবে না। ৬. উভয় পক্ষ যেকোনো গোত্রের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে (যেমন খুজাআ মুসলিমদের সঙ্গে, বনু বকর কুরাইশদের সঙ্গে)। ৭. চুক্তিতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” এর পরিবর্তে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” এবং “মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ” এর পরিবর্তে “মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ” লেখা হয়।
সাহাবীরা কোন কোন ধারায় মন খারাপ করেছিলেন এবং কেন (বিস্তারিত)
সাহাবীরা চুক্তিকে “অপমানজনক” মনে করেছিলেন। বিশেষ করে:
১. এ বছর উমরা না করা — তারা ইহরাম বেঁধে, কোরবানির পশু নিয়ে এসেছিলেন। কাবা চোখের সামনে কিন্তু প্রবেশ করতে পারলেন না। পশু জবাই করে মাথা মুণ্ডন করতে হয়েছে — এটা তাদের কাছে হতাশাজনক ছিল।
২. “মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ” লেখা — সুহাইল বলেছিল “আমরা তোমাকে রাসূল মানি না”। হযরত আলী (রা.) লিখতে অস্বীকার করেন। রাসূল ﷺ নিজে কেটে দেন। এতে সাহাবীরা মনে করেন নবুওয়ত অস্বীকার করা হলো।
৩. অসম শর্ত — কুরাইশ পলাতক ফিরিয়ে দেওয়া — যদি কোনো কুরাইশ মুসলমান হয়ে মদিনায় আসে, তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মুসলমান মক্কায় গেলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। এটা স্পষ্টতই কুরাইশের পক্ষে। হযরত উমর (রা.) খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে রাসূল ﷺ-কে বলেন: “আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন? আমরা কি মুসলমান নই? তারা কি মুশরিক নয়?” রাসূল ﷺ বলেন, “হ্যাঁ, কিন্তু আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি কখনো তাঁর অবাধ্য হব না।”
হযরত উমর (রা.) পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হন। অনেক সাহাবী কাঁদতে কাঁদতে মাথা মুণ্ডন করেন। কিন্তু রাসূল ﷺ বলেন, “এটা বিজয়।”

এই চুক্তি কীভাবে আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন
ফেরার পথে আল্লাহ তাআলা সূরা আল–ফাতহ নাজিল করেন: “ইন্না ফাতাহনা লাকা ফাতহাম মুবীনা — নিশ্চয়ই আমি তোমাকে প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি” (সূরা ৪৮:১)।
রাসূল ﷺ বলেন, “আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সূরা নাজিল হয়েছে যা আমার কাছে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে তার চেয়ে প্রিয়।” হযরত উমর (রা.) জিজ্ঞাসা করেন, “এটা কি সত্যিই বিজয়?” রাসূল ﷺ বলেন, “হ্যাঁ, এটাই সুস্পষ্ট বিজয়।”
কেন শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের জন্য লাভবান হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর মনে হলেও এটি ছিল কূটনৈতিক মহাবিজয়:
- ১০ বছরের শান্তি পেয়ে মুসলমানরা নিরাপদে দাওয়াত দিতে পারেন। ফলে মুসলিম সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পায় (১৪০০ থেকে ১০,০০০-এর বেশি হয় ২ বছরে)।
- কুরাইশরা প্রথমবার মদিনা রাষ্ট্রকে সমমর্যাদার স্বীকৃতি দেয়।
- অনেক গোত্র (যেমন খুজাআ) মুসলিমদের সঙ্গে মিত্রতা করে। কুরাইশের মিত্র বনু বকর তাদের সঙ্গে যায়।
- কুরাইশ চুক্তি ভঙ্গ করে (বনু খুজাআ-এর উপর আক্রমণ করে) — ফলে ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয় হয় রক্তপাতহীনভাবে।
- ইবন হিশাম বলেন: “ইসলামের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিজয় আর হয়নি। যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় মানুষ নিরাপদে মিলিত হয়, আলোচনা করে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।”
- এটি প্রমাণ করে ইসলাম তলোয়ারের জোরে নয়, শান্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে ছড়িয়েছে।
হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল রাসূল ﷺ-এর দূরদর্শিতা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রতীক। আপাত পরাজয় ছিল প্রকৃত বিজয়ের দরজা। এর ফলেই মক্কা বিজয়, আরবের ইসলামীকরণ এবং ইসলামের বিশ্বব্যাপী বিজয় সম্ভব হয়েছে।
আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
