ফার্মগেটের সেই ছবি, যা কাঁদিয়েছিল পুরো দেশকে
দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। বিকেল সাড়ে চারটা। ফার্মগেটের পথচারী-সেতুর নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যায় একজন কিশোর। নাম গোলাম নাফিজ, ডাকনামে অনেকে বলেন নাফিস। বয়স তখন মাত্র সতেরো। কিছুক্ষণ আগেও সে বাসায় ফোন করে বলেছিল, “ফার্মগেটের দিকে আছি, ভালো আছি, তাড়াতাড়ি ফিরব।” নিজের মোবাইলটা বাসায় রেখেই বেরিয়েছিল সেদিন, তাই কল করতে হয়েছিল বন্ধুর ফোন থেকে।
সেই কলই ছিল মায়ের সাথে তার শেষ কথা।
বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষার্থী তখনও কলেজ জীবন শুরুই করেনি ঠিকমতো। এসএসসি শেষ করে সবে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন রাজপথে নেমেছিল, নাফিজ পিছিয়ে থাকেনি। একাধিকবার রাবার বুলেট লেগেছিল তার গায়ে, তবুও সে ফিরে যায়নি। ৪ আগস্ট আবার নেমেছিল রাস্তায়, আর সেদিনই আর ফেরা হয়নি বাসায়।
যে ছবি গোটা জাতিকে থমকে দিয়েছিল
গুলিবিদ্ধ নাফিজকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখনও সে বেঁচে ছিল। একজন রিকশাচালক, নূর মোহাম্মদ, তাকে রিকশায় তুলে নেন। শরীরে গুলির ক্ষত নিয়েও নাফিজ হাত দিয়ে রিকশার রড ধরে ছিল, রিকশার পাদানিতে ঝুলন্ত অবস্থায়। ঠিক সেই মুহূর্তের একটা ছবি পরে সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আর হয়ে ওঠে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম মর্মস্পর্শী প্রতীক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, নূর মোহাম্মদ নাফিজকে নিয়ে ফার্মগেট এলাকার একটি হাসপাতালে ঢুকতে চাইলে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বাধা দেন। বাধ্য হয়ে রিকশাচালক তাকে নিয়ে খামারবাড়ির দিকে চলে যান। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
বাবার ভাষায় সবচেয়ে নির্মম সত্যি
নাফিজের পরিবারের কাছে গিয়ে যা জানা যায়, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। তার বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, তখনও প্রাণ ছিল ছেলের শরীরে, রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে টুকরিতে তুলে ম্যানহোলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কাছাকাছি কোনো ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা না পেয়ে পরে তাকে একটি পুলিশ বক্সে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে ফেলারও চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
এই ঘটনার পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নাফিজদের বাসায় গিয়েছিলেন। সেই রাতে তিনি ফেসবুকে আবেগঘন একটা পোস্ট দেন, যেখানে বাবার মুখে শোনা এই কথাগুলোই তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, নাফিজদের মতো হাজারো শহিদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া চলবে না, যে স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য তারা বুক পেতে দিয়েছিল, সেটা বাস্তবায়ন করতেই হবে।
বিচারের পথে যতটুকু এগোনো গেছে
নাফিজের বাবা মো. গোলাম রহমান নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তৎকালীন আইজিপিসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ জনকে অজ্ঞাতনামা রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করেন তিনি।
তদন্ত এগিয়েছে ধীরে হলেও থেমে থাকেনি। ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট খাগড়াছড়ির মহালছড়ি থেকে গ্রেফতার হন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শচীন মৌলিক, নাফিজ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। অভ্যুত্থানের পর তাকে মহালছড়ি এপিবিএনে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
স্মৃতিতে বেঁচে থাকা নাফিজ
নাফিজের নিজ স্কুল বনানী বিদ্যানিকেতনে তার নামে একটি ভবনের নামকরণ করা হয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সাবেক ছাত্র সবাই মিলে তাকে স্মরণ করেছেন একাধিকবার। যে রিকশাচালক নূর মোহাম্মদ শেষ মুহূর্তে নাফিজের পাশে ছিলেন, তাকেও জাতীয় পর্যায়ে সম্মান জানানো হয়েছে।
গোলাম নাফিজের গল্প শুধু একজন কিশোরের মৃত্যুর গল্প নয়। এটা একটা প্রজন্মের গল্প, যারা রাবার বুলেট খাওয়ার পরেও রাস্তা ছাড়েনি। যারা জানত না যে সেদিনটাই হবে তাদের জীবনের শেষ দিন, তবুও যারা এগিয়ে গিয়েছিল। নাফিজের ত্যাগ, তার বাবার কষ্ট, আর সেই রিকশার রড ধরে থাকা হাতটা, বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল থেকে যাবে।
