দ্য সিভিলিয়ানস । বিশেষ প্রতিবেদন । খন্দকার আজিজুর রহমান |
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর দৃক গ্যালারিতে একটা বক্তৃতা হয়েছিল, নাম “তিনটি ছাত্র গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯, ১৯৯০, ২০২৪): কারণ ও ফলাফল”। বক্তা ছিলেন নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর। মানুষটা নতুন কেউ নন। আশির দশকে নিজে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন, আর ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনটাও তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিন তিনটা গণঅভ্যুত্থানের সাথে এতটা নিবিড় সম্পর্ক খুব কম মানুষের আছে বাংলাদেশে।
এই লেখাটা সেই তুলনামূলক বিশ্লেষণের একটা সংক্ষিপ্ত রূপ, নূরুল কবীরের নিজের লেখা ও সাক্ষাৎকার ঘেঁটে।
১৯৬৯: এক তরুণের মৃত্যু যেভাবে সরকার ফেলে দিল
আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার পেছনে ছিল বৈষম্য, রাজনৈতিক দমন আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো ঘটনা। আন্দোলন ধীরে এগোচ্ছিল, কিন্তু ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদুজ্জামান পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়ার পর পুরো চিত্র বদলে যায়। আসাদের মৃত্যু আন্দোলনকে সরাসরি গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করে। মাত্র দুই মাসের মধ্যে, ২৫ মার্চ, আইয়ুব খানের সরকারের পতন ঘটে।

নূরুল কবীরের হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে মোট প্রাণহানি হয়েছিল ৬১ জনের। সংখ্যাটা ছোট শোনালেও, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটাই ছিল একটা রাষ্ট্র উল্টে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
১৯৯০: নূর হোসেন, ডা. মিলন আর নয় বছরের লড়াই
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামটা ছিল দীর্ঘ, প্রায় নয় বছরের। এই সময়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু ছাত্র নাজির উদ্দিন জেহাদের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু আন্দোলনকে একটা বড় মোড় দেয়। তারপর ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল হক মিলনের মৃত্যু আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

এই নয় বছরের সংগ্রামে প্রাণ গিয়েছিল ২৬ জনের। নূরুল কবীরের বিশ্লেষণ বলছে, ১৯৯০ সালের আন্দোলনে ১৯৮৪ সালে গঠিত শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণির সংগঠিত অংশগ্রহণ ছিল, যা ১৯৬৯ এর কৃষক-শ্রমিক অংশগ্রহণের সাথে মিলে যায়। দুটো আন্দোলনেই সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
২০২৪: সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, সবচেয়ে ভিন্ন
২০১৮ সালে শুরু হওয়া সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০২৪ এর জুনে আবার মাথাচাড়া দেয়, হাইকোর্টের একটা রায়ের পর। জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে এটা রক্তাক্ত রূপ নেয়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু, আর দুই দিন পর ঢাকায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর মৃত্যু, এই দুটো ঘটনা আন্দোলনকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। নূরুল কবীরের ভাষায়, কোনো কোনো মৃত্যু আন্দোলনের বৈপ্লবিক প্রতীকে পরিণত হয়, আবু সাঈদ আর মুগ্ধর মৃত্যু ঠিক সেই কাজটাই করেছিল। “মৃত্যুঞ্জয়ী সাঈদ হয়ে ওঠেন দ্রোহী তারুণ্যের অদম্যতার প্রতীক।”

সংখ্যার হিসাবে এই আন্দোলন আগের দুটোর তুলনায় অকল্পনীয় রকমের রক্তক্ষয়ী। অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫৮২ জনে, পরে সে সংখ্যা আরও বেড়েছে। শুধু ৪ আগস্টেই সারা দেশে মারা যান প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ, যার একটা বড় অংশ ছিলেন সাধারণ প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা। এক হাজারের বেশি মানুষ পুলিশের ছররা গুলিতে চিরতরে দৃষ্টি হারান।
তিনটার মধ্যে পার্থক্য কোথায়
নূরুল কবীরের বিশ্লেষণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটা এখানেই। ১৯৬৯ আর ১৯৯০, দুটো আন্দোলনেই সংগঠিত রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন আর শ্রমিক-কৃষকের সম্মিলিত ভূমিকা ছিল। কিন্তু ২০২৪ এর আন্দোলনে জাতীয় পর্যায়ের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল না। মূল নেতৃত্বে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্দলীয় সমন্বয়করা। গ্রামের কৃষক সমাজ এবার তেমন সম্পৃক্ত হয়নি, শ্রমিকরাও অংশ নিয়েছেন বিচ্ছিন্নভাবে।
তবে এবারের আন্দোলনের একটা অনন্য দিক ছিল, নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ। আর আরেকটা জিনিস আগে কখনো এভাবে দেখা যায়নি, প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীদের মায়েরা নিজেরাই রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। কেউ খাবার-পানি বিতরণ করেছেন সন্তানদের জন্য, কেউ গ্রেপ্তার হওয়া সন্তানকে সাহস দিয়েছেন। নূরুল কবীরের মতে, যখন মায়েরা নিজেরাই রাস্তায় নেমে সন্তানের লড়াইকে শক্তি জোগান, তখন সেই আন্দোলন হারানোর কোনো উপায় থাকে না।
রাষ্ট্র প্রতিবারই একই ভুল করেছে
তিনটা আন্দোলনেই একটা মিল স্পষ্ট, ক্ষমতাসীন সরকার প্রতিবারই সংলাপের বদলে দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, আর সেই দমনপীড়নই শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। ১৯৬৯ সালে আসাদের মৃত্যু, ১৯৯০ সালে মিলনের মৃত্যু, আর ২০২৪ সালে আবু সাঈদ-মুগ্ধর মৃত্যু, প্রতিটাই ছিল রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের ফল, এবং প্রতিটাই সরকারের পতনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। নূরুল কবীরের মূল কথাটা এখানেই, স্বৈরশাসকের বন্দুকের চেয়ে ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামা তরুণদের সংকল্প শেষ পর্যন্ত বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে, বারবার।
দৃকের এই বক্তৃতাটা আসলে শুধু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির গল্প না। এটা একটা প্রশ্নও রেখে যায়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংগ্রাম কেন বারবার রক্তের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়, আর প্রতিবার বিজয়ের পরেও কেন সেই গণতন্ত্র টেকসই হয় না। নূরুল কবীর নিজেই সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী গণঅভ্যুত্থানের গর্ভপাত হওয়ার ইতিহাস আছে। ১৯৬৯ আর ১৯৯০ এর অভিজ্ঞতা যদি কিছু শেখায়, তাহলে সেটা হলো, বিজয়ের পরের সময়টাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
