দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাসমতি চালের নাম ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের অধিকার নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধে নতুন মোড় এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল আদালত ভারতে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের করা আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় বাসমতি শব্দের ওপর একক বাণিজ্যিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ভারতীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। আদালত ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে মামলার বিপরীত পক্ষের আইনগত ব্যয় পরিশোধের নির্দেশও দিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত ২০১৯ সালে। ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অস্ট্রেলিয়ায় চালের জন্য ‘বাসমতি’ শব্দকে প্রত্যয়নমূলক বাণিজ্যচিহ্ন হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে। অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যচিহ্ন নিবন্ধকের প্রতিনিধি ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল, ‘বাসমতি’ শব্দটি শুধু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন করা চালকে অন্যান্য ব্যবসায়ীর বৈধভাবে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা বাসমতি চাল থেকে আলাদা করার মতো স্বতন্ত্রতা তৈরি করে না।
এরপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল আদালতে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। আদালত সেই আপিল খারিজ করায় আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যচিহ্ন ব্যবস্থায় নিবন্ধকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, অস্ট্রেলিয়ার নিবন্ধকের আগের সিদ্ধান্তেই স্বীকার করা হয়েছিল যে পাকিস্তানেও বাসমতি চাল উৎপাদিত হয় এবং পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের এই নাম ব্যবহারের বৈধ অধিকার রয়েছে। ফলে ভারতের আবেদন খারিজ হওয়াকে পাকিস্তান তার কৃষি ঐতিহ্য, রপ্তানি স্বার্থ ও মেধাস্বত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছে।
বাসমতি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দাবি অবশ্য দীর্ঘদিনের। ভারতের সরকারি নথি অনুযায়ী, দেশটিতে বাসমতি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত এবং এর নিবন্ধিত মালিক ভারতীয় কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ভারতের নিবন্ধনে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, দিল্লি, উত্তরাখণ্ড, উত্তর প্রদেশের কিছু অংশ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের নির্দিষ্ট অঞ্চলকে বাসমতি উৎপাদন এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান হলো, বাসমতি ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি বিস্তৃত অঞ্চলে উৎপাদিত হয়ে আসছে, যার অংশ দুই দেশের ভূখণ্ডেই রয়েছে। ফলে কোনো একটি দেশের প্রতিষ্ঠান পুরো ‘বাসমতি’ নামের ওপর একচেটিয়া অধিকার দাবি করতে পারে না।
পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী কামাল খান এ সিদ্ধান্তকে দেশটির কৃষি ঐতিহ্য, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও রপ্তানি পরিচয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের দল এবং অন্যান্য পক্ষকে বাসমতির স্বার্থ রক্ষায় সমন্বিত প্রচেষ্টার জন্য প্রশংসা করেছেন।
পাকিস্তানের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাসমতির ঐতিহাসিক উৎপত্তি, প্রতিষ্ঠিত খ্যাতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতেও এর সুরক্ষায় কাজ করবে তারা। দেশটির কৃষক, চালকল মালিক ও রপ্তানিকারকদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি বিদেশি বাজারে বৈধ পাকিস্তানি বাসমতি চালের পরিচয় বজায় রাখাকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে অস্ট্রেলিয়ার আদালতের এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘বাসমতির ওপর পাকিস্তানের একক মালিকানা প্রতিষ্ঠা’ হিসেবে না দেখে বরং এটি অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষের একচেটিয়া প্রত্যয়নমূলক বাণিজ্যচিহ্ন নিবন্ধনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত। ভারতের নিজস্ব ভৌগোলিক নির্দেশক নিবন্ধনও কার্যকর রয়েছে।
বাসমতির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিচয় নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়ার এই রায় তাই ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশেও একই ধরনের আইনি ও বাণিজ্যিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে আলোচিত হতে পারে।
