লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

সিরিয়ার ‘সেদনাইয়া’ বাশার আল আসাদের কসাইখানা

প্রকাশিত: 16 নভেম্বর 2025

33 Views

The Civilians News

সিরিয়ার 'সেদনাইয়া' বাশার আল আসাদের কসাইখানা

দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প।

দামেস্কের উত্তরে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেদনাইয়া কারাগার। ‘লাল বিল্ডিং’ আর ‘সাদা বিল্ডিং’, যেন একটা জীবন্ত নরক। লাল ভবনে সাধারণ নাগরিক ও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক বন্দি রাখা হত, আর সাদা ভবনে ছিল সামরিক কর্মকর্তা ও সন্দেহভাজন সৈনিক। ১৯৮০ সালে হাফেজ আল-আসাদের হুকুমে নির্মিত এই পৈশাচিক দানবীয় স্থাপনা ২০১১ সালের আরব বসন্ত থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাসার আল-আসাদের পতন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের কান্না, রক্ত ও দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে এই ভবনের প্রতি ইঞ্চিতে।

সিরিয়ার ‘সেদনাইয়া’ বাশার আল আসাদের কসাইখানা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট বলে, এখানে ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে গোপনে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে, প্রতি সপ্তাহে ২০ থেকে ৫০ জন অন্তত। একজন মা আজও তার ছেলেকে খুঁজে ফিরছে, যে শুধু ফেসবুকে লিখেছিল ‘আসাদের পতন চাই’ । আরেকজন ডাক্তার, যে আহত বিক্ষোভকারীকে বাঁচিয়েছিল, তাকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে গ্রেপ্তার করা হয়। গর্ভবতী নারীও বন্দি হয়েছে, তার সন্তান জন্ম নিয়েছে সেই অন্ধকারে, যা কখনো সূর্যের আলো দেখেনি।

সেদনাইয়ার সেলগুলো ছিল মৃত্যুর ফাঁদ। ‘ব্ল্যাক হোল’ নামে বিশ বর্গমিটারের একটা সেলে একশো জনকে ঠাসাঠাসি করে রাখা হতো। দাঁড়ানোর জায়গা নেই, শ্বাস নিতে পারত না কেউ। একজন বন্দি বলেছিল, “আমরা একে অপরের ঘামে ভিজে থাকতাম, পায়খানা করার জায়গা ছিল না, মেঝেতে পচা মলমূত্রে লাশ পড়ে থাকত।” নির্যাতনের বর্ণনা শুনলে হৃদয় কেঁপে ওঠে। ‘

এখানে নির্যাতনের নানা নাম ও নতুন নতুন কৌশল ছিল, যা অত্যান্ত বর্বর।  যেমনঃ ‘জার্মান চেয়ার’- চেয়ারে বেঁধে শরীর এমনভাবে বাঁকানো হতো যে বন্দির পিঠ ভেঙে যেত। মাংস ছিঁড়ে মেঝেতে রক্ত পড়ত।

‘ফ্লাইং কার্পেট’-এ দুই কাঠের তক্তার মাঝে চেপে ধরে লোহার রড দিয়ে পেটানো হতো, হাড় ভাঙার শব্দ আর নির্যাতিতের আর্তচিৎকারে আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে এলও নির্যাতন বন্ধ হতো না।

আরো জানা যায়, জীবন্ত মানুষকে উল্টো করে ঝোলানো হতো সিলিংয়ের সাথে, জীবন্ত অবস্থায়ই তার চামড়া এবং হাড়ের উপরের মাংস ছাড়িয়ে নেয়া হত।  নির্মমতা এখানেই থেমে থাকতো না, চামড়া-মাংস ছাড়ানো মানুষটিকে তীব্র কষ্টে তিলে তিলে মরার জন্য ঐভাইবেই রেখে দেয়া হতো।

যৌনাঙ্গে বিদ্যুৎ দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, নারীদের সন্তানের সামনে ধর্ষণ করা হতো, শিশুদের চোখের সামনে মাকে পেটানো হতো। মানুষের আত্মসম্মান বলে কিছুই অবশিষ্ট রাখা হয়নি। ‘শাবাহ’ (ভূত) নামে প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়িয়ে শ্বাসরোধ করা হতো, অনেকে ছটফট করে মারা যেত।

দিনে একবার পচা রুটি আর পানি। অনেকে ক্ষুধায় মারা যেত, লাশ সেলেই পচত। চিকিৎসা? কোনো চিকিৎসা নেই। আহত অঙ্গ কেটে ফেলা হতো, রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হতো। একজন বন্দি বলেছিল, “আমরা মরার জন্য অপেক্ষা করতাম, কারণ বেঁচে থাকা ছিল আরও বড় শাস্তি।”

সিরিয়ার সামগ্রিক অবস্থা ছিল যেন একটা জীবন্ত নরক। ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৫ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গেছে। ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছিল।

দামেস্কের রাস্তায় বোমার আঘাতে ধ্বংসাবশেষ, আলেপ্পোর শহর ধ্বংস, হোমসে গণকবর। সেদনাইয়ায় প্রতি সোমবার রাতে ৫০ জনকে ফাঁসি দেওয়া হতো, ফাঁসির রাতকে বলা হতো “মনডে হ্যাঙ্গিং নাইট”। চোখ বাঁধা , হাত পিঠে বাঁধা  লাশ ট্রাকে করে তিজরা মিলিটারি হাসপাতালে নেওয়া হতো। সেখানে কিছু লাশ অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলা হতো বা পরিত্যাক্ত স্থানে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে ফেলা হতো।

আল-কুতাইফাহ (দামেস্কের উত্তরে) আর নাজহায় (দক্ষিণে) ২০১৮ সালের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় মাটি সদ্য খোঁড়া হয়েছিল, মূলত এইগুলি ছিল গণকবর। পরবর্তীতে ওই স্থানগুলো খুঁড়ে সন্ধান মেলে  হাজার হাজার মানুষের দেহাবশেষের।

একজন মা তার ছেলের লাশের জন্য আজও অপেক্ষা করছেন, জানেন না সে কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি-না আর মরে গিয়ে থাকলে তার কবরটাই বা কোথায়। ১ লক্ষের বেশি মানুষ গুম করেছিল আসাদ বাহিনী, গুমের স্বীকার পরিবারকে আসাদ বাহিনী বলতো, ‘সে মারা গেছে’, লাশ দেওয়া হতো না।

সিরিয়ার বর্বরতার মূল শেকড় ছিল বাশার আল আসাদের পারিবারিক শাসনব্যবস্থা। সিরিয়ায় প্রায় ৮৫% জনসংখ্যা সুন্নি মুসলিম আর আলাউই জনসংখ্যা ছিল ১২%। এই আলাউই সম্প্রদায়ের অংশই ছিল আসাদ পরিবার, যারা শিয়া মুসলিমের একটি শাখা। তার বাবা হাফেজ আল আসাদ ১৯৮২ সালে হামা শহরে সুন্নি বিদ্রোহ দমনে এমন গণহত্যা চালিয়েছিলেন, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মারা যায়। ওই ঘটনাই প্রমাণ করে দেয় যে আলাউই সংখ্যালঘুরা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে নির্যাতন করে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখাই ছিল পরিবারের প্রধান কৌশল।

বাশার আল আসাদ সেই কৌশলই হুবহু ধরে রাখে। তার রাজনীতির মূল কথা ছিল খুব সরল, যে বিরোধিতা করবে, সে বাঁচবে না। আরব বসন্তের সময় সিরিয়ায় গণআন্দোলন শুরু হতেই তিনি সেই নীতির পূর্ণ এবং নিষ্ঠুর প্রয়োগ করেন।

শুধু অভ্যন্তরীণ বাহিনী নয়, আন্তর্জাতিক সমর্থনও তাকে এই নিষ্ঠুরতা চালাতে সাহস দিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে রাশিয়া সরাসরি বিমান হামলা করে আসাদের পাশে দাঁড়ায়। তারা সিরিয়ান সেনাবাহিনীকে ক্লাস্টার বোমা, ব্যারেল বোমা, উন্নত অস্ত্র সবই সরবরাহ করেছে। রাশিয়ার বোমা হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাসপাতাল, বাজার, স্কুল পর্যন্ত নিশানা থেকে বাদ যায়নি।

ইরানের আইআরজিসি (রেভল্যুশনারি গার্ড) সামরিক উপদেষ্টা, স্নাইপার, সামরিক বিশেষ  ইউনিট পাঠায় আসাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ যোদ্ধারাও যুদ্ধে আসাদের পক্ষে সক্রিয় অংশ নেয়। সিরিয়ার কারাগারে নির্মম নির্যাতনের কৌশল এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে পুনর্গঠনের কৌশল ইরান আসাদ বাহিনীকে শেখায়।

জাতিসংঘে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যেকোনো কঠোর প্রস্তাব উঠলে চীন – রাশিয়া সঙ্গে সঙ্গে ভেটো দেয়। এভাবে আন্তর্জাতিক চাপকে আসাদ থেকে সরিয়ে রাখা হয়। আসাদ বাহিনীকে রকেট, গোলাবারুদ এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ ও তৈরীর প্রশিক্ষণও তারা দিয়েছিলো।

শাব্বিহা নামের আলাউই মিলিশিয়া গ্রুপ সিরিয়ায় ব্যাপক লুট, ধর্ষণ, গণহত্যা চালায়। মুখাবারাত নামে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অপহরণ, গুম, কারাগারে পদ্ধতিগত নির্যাতন চালানোর জন্য ব্যাপক কুখ্যাত ছিল। হাজার হাজার মানুষ টর্চার চেম্বার থেকে আর কখনোই ফিরে আসেনি।

কিন্তু ২০২৪ ডিসেম্বরে আসাদের পতনের পর সেদনাইয়ার দরজা খুলে গেছে। মুক্তিকামী যোদ্ধারা সেদনাইয়ার দরজা খুলে সব বন্দিদের মুক্ত করে দিলেও এক নারকীয় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।  তারা পেয়েছে নির্যাতনের যন্ত্রপাতি, ‘ডেথ রেজিস্টার’ যেখানে লেখা প্রতিদিনের ফাঁসির হিসাব। দেওয়ালে বন্দির রক্তের কালিতে লেখা, “আমরা মরিনি, আমাদের কণ্ঠ এখনো বেঁচে আছে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আসাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে। কিন্তু রাশিয়া-ইরানের ছত্রছায়ায় সে পলাতক। সেদনাইয়া শুধু একটা কারাগার নয় , এটা এক জীবন্ত কসাইখানা যার প্রতিটি  ইট -পাথরে ধ্বনিত হচ্ছে নিরীহ বন্দিদের আহাজারি যা আজও থামেনি।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman