দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ইয়েমেনে ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুনরুদ্ধার করাই সম্ভাব্য অভিযানের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। তবে এর সুনির্দিষ্ট সময় এখনও নির্ধারিত হয়নি। সৌদি আরব সীমিত পরিসরে বাব এল-মান্দেব ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালানো অথবা ইয়েমেনের একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে হামলা চালানোর দুটি বিকল্প বিবেচনা করছে।
সম্ভাব্য অভিযানে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী স্থলযুদ্ধের মূল দায়িত্ব পালন করবে। তাদের সহায়তায় সৌদি বিমানবাহিনী হামলা চালাবে। অভিযানের পরিধি বড় হলে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে সৌদি সরকার, ইয়েমেনের সরকার, হুথি গোষ্ঠী ও মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পরিকল্পনা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সৌদি আরবের বিবেচনায় থাকা দ্বিতীয় বিকল্পটি তুলনামূলকভাবে বড়। এতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ অঞ্চলে একযোগে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হবে হুথিদের বিভিন্ন ফ্রন্টে ব্যস্ত রেখে তাদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা থামানো। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে সীমিত উপকূলীয় অভিযান তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হলেও ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভক্তি বড় ধরনের স্থল অভিযানকে জটিল করে তুলতে পারে।
বাব এল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। চলতি বছর ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বাব এল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা এবং ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযানের প্রস্তুতিতে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে কয়েকটি মিত্র দেশ। পাকিস্তান সামরিক সরঞ্জাম ও সামরিক পরামর্শক পাঠিয়েছে বলে দেশটির কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে। সেপ্টেম্বরে চারটি কার্গো বিমানে করে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এডেনে হালকা কামান ও ড্রোনসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তানের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সামরিক সদস্য সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে বলেও একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে। তাদের মূল দায়িত্ব সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহায়তা করা।
তুরস্কও সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় তুরস্কের তৈরি ড্রোন ইয়েমেনের আকাশে নজরদারিতে ব্যবহারের কথা জানা গেছে। ফ্রান্সও সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরীগুলোর প্রতিরক্ষায় সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এসব দেশ সরাসরি ইয়েমেনে যুদ্ধরত সৌদি বাহিনীর সঙ্গে অংশ নেবে কি না সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৌদি নেতৃত্বাধীন স্থল অভিযানে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য শনাক্তকরণে সহায়তা করছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সৌদি তেল স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
এরই মধ্যে ইয়েমেনে লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। তাইজ অঞ্চলে হুথিদের অবস্থানে সরকারি বাহিনী একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুথিদের অগ্রযাত্রায় হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী নতুন করে সংঘাত বাড়ায় ইয়েমেনের সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক জোটের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধে নামে। ২০২২ সালের অস্ত্রবিরতির পর সীমান্তজুড়ে সংঘাত অনেকটা কমে এলেও চলতি বছরের নতুন উত্তেজনায় পরিস্থিতি আবার দ্রুত বদলে গেছে। এখন বাব এল-মান্দেব ঘিরে সৌদি সামরিক পদক্ষেপ শুরু হলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার পাশাপাশি পুরো লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
