লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

দিল্লিতে নারী বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের যৌন নিপীড়ন ও হেনস্থার অভিযোগ, ‘দ্বিতীয় যন্তর মন্তর’-এর ডাক

প্রকাশিত: 05 অক্টোবর 2026

10 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে টানা তিন দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুর পর্যন্ত বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমলেও ১০ অক্টোবর শনিবার ফের বড় বিক্ষোভ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর একাংশ।

বিক্ষোভের পটভূমি ও সময়রেখা

  • শুরু: শুক্রবার ২ অক্টোবর, অর্থাৎ গান্ধী জয়ন্তীর দিন দিল্লি ও মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।

  • পরবর্তী দুই দিন: শনিবার ও রোববারও কর্মসূচি অব্যাহত ছিল; পুলিশের আচরণ ছিল মারমুখী।

  • ভবিষ্যৎ ডাক: ১০ অক্টোবর শনিবার ফের দিল্লিতে বড় আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে।

অনেক বিক্ষোভকারী এ আন্দোলনকে “যন্তর মন্তর ২.০” বলে অভিহিত করছেন। তবে দিল্লিতে পুলিশ এবার আগের চেয়ে বেশি তৎপর; বিক্ষোভকারীদের কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

রোববারের ‘সিটিজেন্স মার্চ’ ও পুলিশি আটক

রোববার সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী ও ছাত্র সংগঠনগুলো ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর মন্তর অভিমুখে ‘সিটিজেন্স মার্চ’ বের করে। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

মিছিল চলাকালীন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসা-র সভাপতি নেহা বোরাসহ একাধিক নেতাকে আটক করা হয়।

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার

নারী সাংবাদিক ও বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ

শনিবার দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিকদের যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে রোববার আন্দোলন আরও তীব্র হয়।

অভিযোগের মূল বিষয়গুলো:

  • এক নারী সাংবাদিকের দাবি, আইসা সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করার সময় এসিপি বিবেক ভগত তার বুকে হাত দেন ও ধাক্কা দিয়ে সরে যান।

  • আরও এক প্রবীণ নারী সাংবাদিক ও এক তরুণী বিক্ষোভকারী দিল্লি পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হামলার অভিযোগ তোলেন।

  • নেহা বোরা অভিযোগ করেন, তাকে যে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে একজনও নারী পুলিশকর্মী ছিলেন না। পরে তাকে যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়; তখন তার ফোনও ছিল না।

  • শনিবারের বিক্ষোভে নেহা বোরা মাটিতে পড়ে যান; তিনি দাবি করেন, এক নারী পুলিশকর্মী তাকে কনুই ও নখ দিয়ে আঘাত করেন।

এরপর শনিবার ও রোববার সাংবাদিকরা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার বাইরে প্রতিবাদ জানান। দিল্লি পুলিশ অভিযোগ নস্যাৎ না করলেও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছে, নারীদের হেনস্থার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

আম আদমি পার্টি ও অন্যান্য দলের অংশগ্রহণ

এ প্রতিবাদে আম আদমি পার্টির কর্মীরাও বড় সংখ্যায় ইন্ডিয়া গেট এলাকায় উপস্থিত হন। দলটির দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকেও বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করে।

সৌরভ ভরদ্বাজ এক্স-এ একটি ভিডিও পোস্ট করে লেখেন, “এগুলো আমার জুতো, যা হাওয়ায় ঝুলে আছে। আজ ইন্ডিয়া গেটে দিল্লি পুলিশ আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় আমার মুখ ধরা না পড়ে।” ভিডিওতে পুলিশকর্মীদের তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।

সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, “আজও নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময়ে পুলিশ আমাদের জোর করে আটক করেছে। এটি শুধু এক দিনের প্রতীকী প্রতিবাদ নয়, বরং জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।”

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও কর্মসূচি

  • ইন্ডিয়ান ইউথ কংগ্রেস: রোববার সন্ধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল করে। ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়। ইউথ কংগ্রেস এক্স-এ লিখেছে, “যন্তর-মন্তরকে আবার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতারের দাবিতে আইওয়াইসি কর্মীরা যন্তর-মন্তর রোডে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছে।”

  • শিবসেনা ও এমএনএস: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা এবং রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস) রোববার মুম্বাইয়ে ‘গর্জনা মোর্চা’ আয়োজন করে। উভয় নেতাই এতে অংশ নেন।

  • ককরোচ জনতা পার্টি: রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইতে আন্দোলনরত সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে ১০ অক্টোবর নতুন করে দিল্লিতে আন্দোলনের ডাক দেন। একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি বলেন, “আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি, আপনিও গুছিয়ে নিন, দিল্লি রওনা হতে হবে।”

শনিবার কী ঘটেছিল?

শনিবার বহু সমাজকর্মী যন্তর-মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে দিল্লি পুলিশ কেরল হাউসের কাছে তাদের আটকে দেয় ও আটক করে। বিবিসি নিউজ হিন্দির সংবাদদাতা দিলনওয়াজ পাশা জানান, বিক্ষোভকারীরা যন্তর-মন্তরের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেননি; বিপুল পুলিশবাহিনী তাদের কেরল হাউসের কাছে আটকে দেয়।

এদিনের বিক্ষোভে আইসা কর্মীদের পাশাপাশি সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল ও প্রশান্ত ভূষণও উপস্থিত ছিলেন। তাদেরও অন্যদের মতো আটক করা হয়।

নেহা বোরা, প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জয় সিংকে আটক করা হলেও কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছতে দেওয়া হয়নি।

মুম্বাইয়ে সিজেপির বিক্ষোভ

ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর ককরোচ জনতা পার্টি ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে প্রতিবাদের ডাক দেয়। মুম্বাইয়ে সিজেপির ডাকে শিবাজি পার্কে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পুলিশ অনুমতি না দিলেও বিক্ষোভকারীরা সেখানে পৌঁছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, “সরকার এতটাই অযোগ্য যে দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বার আমাদের বিক্ষোভ করতে হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “গান্ধি যদি এই দেশের আত্মা হন, তবে আম্বেদকর এই দেশের মেরুদণ্ড। ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ও নেহরুই আমাদের ভোটাধিকার দিয়েছেন।”

মুম্বাইয়ের কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি ও সুরকার-গায়ক বিশাল দাদলানিও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনাও এ আন্দোলনকে সমর্থন জানায়।

দিল্লিতে পুলিশি কড়াকড়ি ও মেট্রো বন্ধ

একই সময়ে আইসা ও কয়েকজন সমাজকর্মী দিল্লির যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি চেয়েছিলেন। দিল্লি পুলিশ যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি; দিল্লি মেট্রোও ১০টির বেশি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। তবু বিপুল সংখ্যক মানুষ যন্তর-মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে।

নির্বাচন কমিশনের বিশেষ অভিযান

এদিকে নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সকালে এক্স-এ পোস্ট করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বাদ পড়া নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়। এই অভিযানের আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের চিহ্নিত করা এবং ফর্ম সিক্স পূরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের মতে, বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি বাড়ি যাবেন, তরুণ ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবির আয়োজন করা হবে।

কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে?

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাদে আরও যে দুজন নির্বাচন কমিশনার আছেন, তারা গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের জানানো হয়নি এবং তারা বারবার আপত্তি তুলেছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, নাম বাদ দেওয়া এবং তথাকথিত “অননুমোদিত ও বেআইনি” পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলো ও ককরোচ জনতা পার্টি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman