লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু: দিনে গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ, কোন দেশে বেশি

প্রকাশিত: 06 অক্টোবর 2026

3 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে ফিরে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ, যা হিসাব করলে দাঁড়ায় দিনে গড়ে ১৪টির বেশি।

মৃত্যুর চিত্র ও দেশভিত্তিক তথ্য
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২৭৩ দিনে ৪,০৬০টি মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে—প্রায় ২ হাজার। এরপর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া, যেখানে গত আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ থাকলেও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

মধ্যপ্রাচ্য থেকেই আসে মোট মরদেহের ৭০ শতাংশের বেশি। সৌদি আরব এককভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

মৃত্যুর প্রধান কারণ
মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
স্বাভাবিক মৃত্যু: ৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা: ১৬ শতাংশের বেশি মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বিদ্যুতায়িত হয়ে।
সড়ক দুর্ঘটনা: এককভাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়—২ হাজার ৬৪৯ জন।
কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা: মোট মৃত্যুর ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী মারা যান কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়।

মরদেহ দেশে আনতে হয়রানি
মরদেহ দেশে আনতে পরিবারগুলোকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি দূতাবাস নেই (যেমন কম্বোডিয়া), সেখান থেকে মরদেহ আনতে সময় লাগে কয়েক মাস থেকে দেড় বছর পর্যন্ত। পাবনার আল আমিনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তিনি মারা যান ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল, কিন্তু মরদেহ দেশে আসে ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর—প্রায় দেড় বছর পর।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি বলছে, নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু অনিয়মিত কর্মী (বৈধ কাগজপত্র নেই) হলে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

সরকারি সহায়তা ও অভিযোগ
প্রতিটি মরদেহ দাফনে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয়। এরপর তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এ বছর প্রথম ছয় মাসে মরদেহ দাফনে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

তবে আবেদন করার পর দিনের পর দিন কল্যাণ বোর্ডে ঘুরতে হয় বলে পরিবারগুলোর অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা পেতে পেতে পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়।

মৃত্যুর কারণ যাচাইয়ের অভাব
অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, কর্মী যে দেশে মারা যান, সেখান থেকে মৃত্যুর একটি কারণ লিখে পাঠানো হয়। রোগসহ স্বাভাবিক মৃত্যু দেখানো হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, খুন, আত্মহত্যায় বাধ্য করার অভিযোগ আছে; কিন্তু বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর কোনো কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয় না।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, “প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ জানা গেলে মৃত্যু কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে সরকার।”

তাপজনিত ঝুঁকি ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে অবকাঠামো নির্মাণ খাতে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। এতে তাপজনিত নানা রোগে কিডনি, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে শরীরের সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশে তাপ আরও বাড়ছে, যা প্রবাসীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে বিএমইটি তিন দিনের কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু এতে গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচার-আচরণসহ নিরাপত্তা সচেতনতা বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণা দেওয়া হয় না। যে দেশে কাজে যাচ্ছেন, সে দেশের কাজের ধরন, পরিবেশ ও চাপ সামলানোর কৌশল, কর্মঘণ্টা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাসহ কীভাবে ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে সুস্থ রাখা যায়, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

নারী শ্রমিকদের ঝুঁকি
জীবনযুদ্ধে লড়াই করা নারীরা বিদেশে যান। তাঁদের আত্মহত্যার কারণগুলো জোরালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৭১৪ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফেরে।

সরকারের বক্তব্য
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর বলেন, “বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে। মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “যাঁরা অনিয়মিত কর্মী, তাঁদের মরদেহ আনতেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাই করতে করণীয় ঠিক করা হবে।”

প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু কমানো হলে সরকারকে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে: মৃত্যুর কারণ যাচাই করা, গন্তব্য দেশের সাথে শ্রমিক নিরাপত্তা চুক্তি জোরদার করা, প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণের মান উন্নত করা, এবং দূতাবাসগুলোর ভূমিকা শক্তিশালী করা। শ্রমিকদের জীবন তাদের রেমিট্যান্সের চেয়ে বেশি মূল্যবান—এই বার্তাটি এখনই বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময়।

সূত্রঃ প্রথম আলো

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman