লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ইউরোপে ‘মানব চিড়িয়াখানা’ ও ভুলে যাওয়া এক কলঙ্কিত ইতিহাস

প্রকাশিত: 29 ডিসেম্বর 2025

38 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।

একটা ছোট শিশুর চোখে তখন বিস্ময়। তার সামনে খাঁচার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে আরেক মানুষ। গায়ের রং কালো, পরনে অচেনা পোশাক। দর্শনার্থীরা হাসছে, আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। কেউ কেউ ছুড়ে দিচ্ছে খাবার, ঠিক যেমনটা করা হয় পশুর খাঁচায়। শিশুটি জানে না, সে যে দৃশ্য দেখছে তা মানুষের প্রতি ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস অপমানগুলোর একটি।

সময়টা উনিশ শতকের শেষ ভাগ। জায়গাটা বেলজিয়াম। আজ অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এক সময় বেলজিয়ামে সত্যিই ছিল ‘কালো মানুষের চিড়িয়াখানা’। ইউরোপের উপনিবেশবাদী দম্ভ আর বর্ণবাদী মানসিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ছিল এসব মানব প্রদর্শনী। আফ্রিকার কঙ্গো অঞ্চল থেকে জোর করে আনা হতো নারী, পুরুষ ও শিশুদের। খাঁচার ভেতর বা কৃত্রিম গ্রামে রেখে তাদের ‘আদিম’, ‘বন্য’ মানুষ হিসেবে দেখানো হতো ইউরোপীয় দর্শকদের সামনে।

১৮৯৭ সালে ব্রাসেলসে আয়োজিত বিশ্ব প্রদর্শনীতে প্রায় ২৬০ জন কঙ্গোলিজ মানুষকে এভাবে প্রদর্শন করা হয়। শীত, অপুষ্টি আর অবমাননার মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। অথচ তাদের মৃত্যু ছিল নিছক ‘প্রদর্শনীর ক্ষয়ক্ষতি’।

এটা শুধু মানবিক অবক্ষয় নয়, এটি ছিল মানবাধিকার সম্পূর্ণভাবে ভুলুণ্ঠনের উদাহরণ। মানুষকে মানুষ হিসেবে নয়, পশু হিসেবে দেখার দর্শনই ছিল এর ভিত্তি। তাদের কথা বলার অধিকার ছিল না, যাওয়ার অধিকার ছিল না, এমনকি বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাও ছিল না।

বেলজিয়াম একা নয়। এই বর্বরতার ইতিহাস ছড়িয়ে আছে ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশে। ফ্রান্সে প্যারিসের ‘জার্দিন দ’অ্যাক্লিমাটাসিওঁ’ পার্কে আফ্রিকান ও এশীয় মানুষদের প্রদর্শন করা হতো। জার্মানিতে হামবুর্গ ও বার্লিনে ‘ভোলকারশাউ’ নামে মানব প্রদর্শনী ছিল নিয়মিত ঘটনা। যুক্তরাজ্যে আফ্রিকান মানুষদের ‘এথনোলজিক্যাল শো’-এর নামে মঞ্চে তোলা হতো। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নিউইয়র্ক ও সেন্ট লুইসের প্রদর্শনীতে আদিবাসী ও আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর মানুষদের ‘নিম্নজাত’ প্রমাণের জন্য দেখানো হয়েছে।

এই চিড়িয়াখানাগুলো কেবল বিনোদনের জায়গা ছিল না। এগুলো ছিল উপনিবেশবাদকে বৈধতা দেওয়ার যন্ত্র। দর্শকদের বোঝানো হতো, এই মানুষগুলো সভ্য নয় বরং ঊনমানুষ, তাই তাদের সাথে যে কোনো আচরণ করা ন্যায্য।

আজ শত বছর পেরিয়ে গেছে। খাঁচাগুলো ভেঙে গেছে, কিন্তু ইতিহাসের এই দাগ এখনো মুছে যায়নি। বর্ণবাদ, বৈষম্য আর ক্ষমতার দম্ভ আজও ভিন্ন রূপে ফিরে আসে।

এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবাধিকার কোনো স্বাভাবিক উপহার নয়। এটি রক্ত, অপমান আর দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল। মানুষকে যদি মানুষ হিসেবে না দেখা হয়, তবে সভ্যতার মুখোশের আড়ালেও বর্বরতা বাসা বাঁধে।

ইতিহাসের এই সত্য জানানো জরুরি। কারণ ভুলে গেলে, সেই খাঁচা আবার তৈরি হতে সময় লাগে না।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman