দ্য সিভিলিয়ানস । আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।
মানুষ থমকে দাঁড়াচ্ছে। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কারও চোখে পানি। বারবার চালু হচ্ছে সেই শেষ রেকর্ড করা বার্তা। যেন কেউ বোঝার চেষ্টা করছে এমন এক শূন্যতা, যা কেবল একটি প্রাণ হারানোর চেয়েও অনেক বড়।
সোমবার হামাসের সশস্ত্র শাখা আল কাসাম ব্রিগেড তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক মুখপাত্র আবু উবাইদার শাহাদাতের বিষয়টি নিশ্চিত করে। টেলিভিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন মুখপাত্র এই ঘোষণা দেন। হামাসের দীর্ঘদিনের রীতি অনুযায়ী তিনিও নিজের পরিচয় গোপন রেখে একই ছদ্মনাম, আবু উবাইদাহ, গ্রহণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মুখোশের আড়ালের মানুষটি ছিলেন হুজাইফা সামির আল কাহলুত, যিনি আবু ইব্রাহিম নামেও পরিচিত। তিনি শহীদ হয়েছেন। একই হামলায় শহীদ হয়েছেন হামাসের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, যাদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ সিনওয়ার, মোহাম্মদ শাবানা, হাকাম আল ইসা ও রায়েদ সাদ।
১৯৮৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সউদি আরবে জন্ম নেওয়া আবু উবাইদা চার সন্তানের জনক ছিলেন। শৈশব কেটেছে গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে। গাজা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক ধর্মতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের দিকে আল কাসাম ব্রিগেডের সঙ্গে তার পথচলা শুরু হয়। ২০০৫ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনের মুখপাত্র হন এবং ২০০৬ সালে ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে বন্দি করার ঘোষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান।
গাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর সেই কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল নির্যাতিতের ভরসা। তাকে কেউ প্রকাশ্যে দেখেনি, কিন্তু লাল সাদা কেফিয়াহ আর শান্ত স্বরে উচ্চারিত বার্তাগুলো আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে যেত, পৌঁছে যেত মুক্তিকামী মানুষের শিরা উপশিরায়।
জাবালিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আল আত্তার বলেন, আকাশ যখন বিস্ফোরণে কেঁপে উঠত, তখন আবু উবাইদার কণ্ঠ আমাদের মনে করিয়ে দিত আমরা একা নই। খান ইউনিসের সালাহ কুদাইহের ভাষায়, তিনি ছিলেন আমাদের নিজেদের গল্প বলার কণ্ঠ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আবু উবাইদা কেবল একজন মুখপাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন যুদ্ধের ভেতর বর্ণনার একজন কৌশলী নির্মাতা। তার অনুপস্থিতি হামাসের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে।
২০২৫ সালের ১৮ জুলাই দেওয়া তার শেষ ভাষণ আজ গাজায় স্মৃতির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুখোশের আড়ালের সেই কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু তার শব্দগুলো এখনো ধ্বংসস্তূপের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
