লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

ঐতিহ্য থেকে নেতৃত্বে: খালেদা জিয়ার গল্প শেষ, তারেকের শুরু

প্রকাশিত: 11 ফেব্রুয়ারী 2026

31 Views

The Civilians News

২০২৫ সালের ঘটনাবহুল বছরটি শেষ হওয়ার ঠিক আগে, ডিসেম্বরের শেষ পাঁচ দিন যেন বাংলাদেশে নিজের রাজনৈতিক শিলালিপি লিখে গেল। বহু প্রতীক্ষিত এক প্রত্যাবর্তন, আর বহুদিনের আশঙ্কিত এক বিদায়। এই দুই ঘটনার মাঝখানে দেশ যেন কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়েছে। স্মৃতি আর প্রতিশ্রুতির মাঝামাঝি এক অবস্থানে। যেন শোক আর প্রত্যাশা প্রায় একসঙ্গেই এসে হাজির হয়েছে, যা শুধু দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকেই নয়, পুরো জাতির মনস্তত্ত্বকেও নতুনভাবে নাড়া দিয়েছে।

২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং এর মাত্র পাঁচ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর তার মা, দলীয় চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এক সপ্তাহের কম সময়ে ঘটে যাওয়া এই দুই ঘটনা বিএনপিকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

বিএনপির জন্য খালেদা জিয়ার মৃত্যু একটি যুগের অবসান। প্রতিষ্ঠাতা নেতা, তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং প্রজন্ম ও উপদল পেরিয়ে দলের সর্বশেষ ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তার উপস্থিতি দলীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি ছিল, যদিও দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক ছিলেন। তার প্রয়াণ একদিকে শূন্যতা তৈরি করেছে, অন্যদিকে উত্তরাধিকার প্রশ্নে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়েছে। ঐতিহ্য আর নতুন নেতৃত্বের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দল এখন এক নির্ধারণী মুহূর্তে।

আসন্ন নির্বাচন এই দুই ঘটনার সরাসরি প্রভাবের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। মাঠে উপস্থিত সুস্পষ্ট নেতৃত্ব ও নতুন গতি নিয়ে বিএনপি ভোটের লড়াইয়ে নামছে। এতে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে এবং একতরফা প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে। তবে দলের সামনে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও আছে। অনির্ধারিত ভোটারদের আস্থা অর্জন, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কেবল আবেগ ও উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভর না করে ভবিষ্যতমুখী কর্মসূচি উপস্থাপন করা এখন জরুরি।

নেতৃত্বের ভার এখন সরাসরি তারেক রহমানের কাঁধে। দীর্ঘদিন দূরবর্তী নেতৃত্ব, আইনি বাধা এবং বিচ্ছিন্ন কমান্ড কাঠামোর মধ্যে দল পরিচালিত হয়েছে। তার শারীরিক উপস্থিতি বিএনপিকে নতুনভাবে সংগঠিত, সমন্বিত ও তৃণমূলকে সক্রিয় করার সুযোগ দিয়েছে। সমর্থক ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ের কাছেই নেতৃত্বের কাঠামো এখন স্পষ্ট। তবে এর সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যাশা এবং নজরদারি, যা দলীয় ভেতর ও বৃহত্তর জনপরিসর উভয় জায়গা থেকেই আসবে।

এই দুই ঘটনা শুধু বিএনপিতেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও এর প্রভাব পড়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু দলীয় বিভাজন অতিক্রম করে সহানুভূতির স্রোত সৃষ্টি করেছে, যা বহুদলীয় প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির এক সময়ের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। বিএনপি এই আবেগকে সমঝোতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে রূপ দেবে, নাকি মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যাবে, তা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ গতিপথ। তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল হয় মেরুকরণ কমাতে পারে, নয়তো আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এখন তার ওপর বিরাট দায়িত্ব। সক্রিয় নেতৃত্ব নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ফলাফল গ্রহণযোগ্য হবে, তা দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলে আগের চেয়ে বেশি নজর কাড়বে। সংযম ও সংলাপের পথ বেছে নিলে বিদ্যমান বিভাজন কমানো সম্ভব।

সবশেষে, এই দুই ঘটনা বাংলাদেশের সামনে এক বিরল সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। এক যুগের অবসান ও আরেক যুগের সূচনা পুরোনো বিভাজনকে কঠোর করতে পারে, আবার নবায়নের সুযোগও এনে দিতে পারে। আসন্ন নির্বাচন গণতান্ত্রিক আস্থা পুনর্গঠনের পথ হবে, নাকি আরেকটি হারানো সুযোগ, তা নির্ভর করবে শুধু বিএনপির রূপান্তরের ওপর নয়, বরং সকল রাজনৈতিক পক্ষের সদিচ্ছার ওপর। প্রতিষ্ঠান, সংলাপ ও ভোটারের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে কি না, সেটিই হবে মূল প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত এই দুটি ঘটনার প্রভাব প্রতীকের চেয়ে বেশি মূল্যায়িত হবে সিদ্ধান্ত দিয়ে। নতুন নেতা কি দলকে কেবল উত্তরাধিকারনির্ভর রাজনীতি থেকে কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতিতে নিতে পারবেন? তার নেতৃত্ব কি মেরুকরণ কমিয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ বিস্তৃত করবে? সফল হলে তার প্রত্যাবর্তন বিরোধী রাজনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। ব্যর্থ হলে এটি হয়তো প্রতিশ্রুতিময় কিন্তু পুরোনো ধাঁচে আবদ্ধ আরেকটি মুহূর্ত হয়েই থাকবে।

ইতিহাস দ্রুত এগিয়েছে, হয়তো অতিরিক্ত দ্রুত। আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পথে দেশ কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণ করবে তারেক রহমান ও অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষ কতটা প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

 

 

নোট : লেখাটি লেখকের ইংরেজী লেখার বাংলা অনুবাদ।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman