গত মঙ্গলবার রাতে দেরি করে একটি ভাইরাল ভিডিও ক্লিপ আমার মনে চিন্তার ঝড় তোলে। এটি ছিল৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের একটি নাটক, যেখানে ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামান একজন সেনা সদস্যের সঙ্গে তুমুল বাকযুদ্ধে লিপ্ত। ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা সেনানিবাসের প্রবেশপথে, যেখানে জামায়াত প্রার্থী তার বন্দুকধারী সঙ্গীসহ প্রবেশ করার অনুমতি পাননি, সেনানিবাসের নিরাপত্তা বিধি মেনে।
জামায়াত প্রার্থীকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে সেনানিবাসের ভেতরে তার বন্দুকধারী গার্ড ছাড়াই সেনাবাহিনী তাকে নিরাপত্তা দেবে, কিন্তু তিনি তার জেদি ও অহংকারী মনোভাব থেকে একটুও নড়েনি। হয়তো তার ব্যক্তিগত বন্দুকধারী সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের চেয়ে তার জীবন রক্ষায় বেশি নিষ্ঠাবান বা পারদর্শী অথবা তার বন্দুক আমাদের সেনাবাহিনীর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের চেয়ে বেশি মারাত্মক।
লম্বা কথা সংক্ষেপে বলতে গেলে—জামায়াত প্রার্থীর মৌখিক বাক্যবাণ ছিল একেবারে রাজনৈতিক সোপ অপেরার মতো। ভিডিও ক্লিপে যে দৃশ্য ধরা পড়েছে তাতে দেখা যায় জামায়াত প্রার্থী পুরো উত্তেজিত অবস্থায় সেনাবাহিনীর দিকে যে অভিযোগ ছুড়ছেন, জন্মদিনের পার্টির পিনাটের মতো। সেনা সদস্য অসাধারণ ধৈর্যের সঙ্গে বারবার সেনানিবাস এলাকার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার নিয়ম ব্যাখ্যা করছেন, কিন্তু মি. খালিদুজ্জামান (তার মাথা ও হৃদয়কে আশীর্বাদ করি) পুরোদমে তার বাক্যবাণ চালিয়ে যাচ্ছেন, নিরুপায় সেনা সদস্যদের ওপর বুলির গ্রেনেড ছুড়ছেন।
শুরুতে তিনি সেনাদের বিরুদ্ধে কিছু রাজনৈতিক নেতার ব্যাপারে “পক্ষপাতিত্ব”র অভিযোগ তোলেন। আর ঠিক যখন মনে হয় যে বিষয়টিকে আরো বেশি নাটকীয় করার সুযোগ নেই, জামায়াত প্রার্থী পুরো শেক্সপিয়রীয় হয়ে ওঠেন এবং চিৎকার করে বলেন, “তারেক জিয়ার ক্ষেত্রে তো তোমরা জিভ দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করো, তাহলে সে (খালিদুজ্জামান) কেন যেতে পারবে না?” যেন আগের রাতেই তিনি একটি গোপন ক্লাব আবিষ্কার করেছেন যেখানে সেনা সদস্যরা জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে চা পান করেন একসঙ্গে এবং তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সেনানিবাসে প্রবেশের পথ বন্ধ করার পরিকল্পনা করেন।
আমার ইচ্ছা হয়, যদি ঢাকার অভদ্র ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকার সময় আমারও এমন বোম্বাস্টিক রাজনৈতিক ফ্লেয়ার থাকতো, বিশেষ করে ঢাকা-১৭ আসনের বাসিন্দা হিসেবে। ধরা যাক আমি ১২ ফেব্রুয়ারি আমার মায়ের সঙ্গে ভোট দিতে প্রস্তুত হচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ আমাদের বিকল্পগুলো দেখতে একটা টিভি রিয়েলিটি শো শুরু হলো এবং তা যেন পুরোপুরি ভুল পথে চলে গেলো।
জামায়াত প্রার্থীর অভদ্র ও হাস্যকর প্রতিক্রিয়া আমাকে হতবাক করে দিয়েছে। এটাই কি সত্যি যে সএই ধরনের নেতৃত্ব যাকে আমরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করতে যাচ্ছি?
ভিডিও ক্লিপে তাকে দেখে মনে হয়েছে যেন একটা মেলোড্রামা চলছে—নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি ও পোজ সহ, যা কোনো সোপ অপেরা তারকাকেও গর্বিত করবে। একজন প্রার্থী যিনি একটি যৌক্তিক নিরাপত্তা বিধির ওপর সংবেদনশীল সামরিক এলাকায় পুরো রাগে ফেটে পড়েন, এক পর্যায়ে মনে হয় যেন তাকে মনোপলি খেলায় ইচ্ছাকৃতভাবে ঠকানো হয়েছে।
লক্ষ টাকার প্রশ্ন: যদি মি. খালিদুজ্জামান সেনানিবাস এলাকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তাহলে তিনি যদি সত্যিই জিতে যান তাহলে তার এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন? হয়তো তিনি সব অনুষ্ঠানে লাল গালিচা সংবর্ধনা দাবি করবেন, তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মার্চিং ব্যান্ড আর কনফেটি সহ।
পুরো ভিডিও ক্লিপ দুবার দেখার পর আমি দ্বিতীয় চিন্তা না করেই তার নাম আমার পছন্দের প্রার্থী তালিকা থেকে মুছে দিয়েছি। ঢাকা-১৭ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি আসন এমন একজন রাজনীতিবিদকে বেছে নিতে পারে না যিনি শিষ্টাচারের মোমেন্টামটাই মিস করে ফেলেছেন। জামায়াত নেতার এই অযথা উত্তেজনার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক সভ্যতার জন্য চোখ খোলার মতো শিক্ষা।
ভোটাররা এমন নেতা চান যারা চাপের মুখে শান্ত থেকে তা যুক্তিযুক্তভাবে সামলে নিবেন, এমন প্রার্থী নয় যারা খেলার মাঠে দেরিতে নাম ডাকা বাচ্চাদের মতো অভিযোগের আশ্রয় নেন। এমন একটা দেশে যেখানে রাজনৈতিক প্রচার ও বক্তৃতা প্রায়ই সার্কাসের মতো হয়ে যায়, আমাদের এমন প্রতিনিধি দরকার যারা সমস্যার উপরে উঠে সমস্যাটি সমাধান করবেন।
একটু সম্মান সূচক আচরণ অবশ্যই অনেক দূর যায়, বিশেষ করে সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যারা আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এবং সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আসুন আমরা সবাই ঘটে যাওয়া এই উল্লিখিত ঘটনাটির প্রতি আরেকবার চিন্তা করি এবং নিজেদের মনে করিয়ে দিই যে, একজন রাজনৈতিক নেতার আলোচনা মার্জিত হওয়ার ক্ষমতা যেকোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি একজন প্রার্থী একটি সাধারণ চেকপয়েন্ট নিরাপত্তা বিধি সামলাতে না পারেন এবং রাগে ফেটে না পড়েন, তাহলে আমরা কীভাবে তাকে জনপদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের ভাড় দেব? তাই ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আমি এমন কাউকে খুঁজছি যিনি শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতি সঠিকভাবে পরিচালনাই করবেননা, বরং সম্মান ও দায়িত্বের সঙ্গে তা পালন করবেন।
শেষ করতে গিয়ে বলব, আসন্ন নির্বাচনে আমি আমার আসনে একজন যত্নশীল ও সচেতন জনপ্রতিনিধি দেখতে চাই, কোনো বিঘ্নকারী ও মেলোড্রামাটিক পার্শ্বচরিত্র নয়। যদি আপনারাও আমার মতো হতবাক হয়ে থাকেন, তাহলে আসুন পরিণত ও মননশীল প্রার্থী বেছে নেওয়ার জন্য একটা আওয়াজ তুলি, আশা করি পরবর্তী রাজনৈতিক নাটকটা একটু কম বিশৃঙ্খল হবে।
নোট : লেখাটি লেখকের ইংরেজী লেখার বাংলা অনুবাদ।
