দ্য সিভিলিয়ানস | মতামত | খন্দকার আজিজুর রাহমান |
ইরানের সাথে মার্কিন-ইজরাইল জোটের যুদ্ধ শুরুর তৃতীয় বা চতুর্থ দিন থেকেই একটা ব্যাপার আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। “এছাড়াও মদ্ধপ্রাচ্চে আমরা যা দেখছি এটাই বাস্তব দৃশ্য নাকি আমাদের এমনটা দেখানো হচ্ছে, যা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। ” আমি ইরানের মিলিটারি বা মিসাইল পাওয়ারকে খাটো করে দেখছি না। কিন্তু আমিরিকার মতো পোড় খাওয়া সুপার পাওয়ার সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে গেছে, অন্তত আপাত দৃষ্টিতে তো তাই মনে হচ্ছে।
ইরানের ব্যাপক প্রতিরোধী হামলায় ইজরাইল তো বটেই পুরো মদ্ধপ্রাচ্চ্য কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে পড়েছে। তেলআবিব, হাইফা সহ ইজরাইলের প্রায় সব বড় শহর আক্রান্ত। এছাড়াও উপসাগরীয় তেল সমৃদ্ধ প্রতিটি দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা, যেমনঃ তেলক্ষেত্র, এয়ারপোর্ট, বিলাসবহুল হোটেল সবই গুরুতরভাবে আক্রান্ত। কিন্তু দেশগুলো, বিশেষ করে আরব দেশগুলো চোখে পড়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। কেন? এই ‘কেন’ নিয়ে আর একটু পরে আলাপ করব।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, যে দেশ থেকে তাদের দেশে হামলা করা হবে এবং যে ধরণের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হবে, ইরান ওই দেশের একই লক্ষ্যবস্তুতে সর্বোচ্চ শক্তিতে আঘাত করবে। হয়েছেও তাই। সম্প্রতি সৌদি আরব ও কাতার থেকে থেকে ইরানের তেল ও গ্যাসক্ষেত্র লক্ষ্য করে হামলা চালালে ইরানও দেশ দুটির বড় বড় প্রায় সব কয়েকটি তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে ভয়াবহ হামলা চালায়। এতে দেশ দুটি সম্পূর্ণ দিশাহারা হয়ে গেছে, অন্তত আপাত দৃষ্টিতে তো তাই মনে হচ্ছে।
এখানে মনে রাখা দরকার, এই যুদ্ধে বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। যেমনঃ মার্কিন বাহিনীর মধ্যে প্রচার রয়েছে এটিই হবে শেষ ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেড যার মধ্য দিয়ে বাইবেলে বর্ণিত মাসিহা আসবেন, ইজরাইলি ধর্ম গ্রন্থের মতও একই, ইজরাইল তো প্রকাশ্যেই ধর্মযুদ্ধ করছে এবং তাদের লক্ষ্য হলো ‘গ্রেটার ইজরাইল’ নির্মাণ করা। যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্চের বেশ বড় অংশ রয়েছে। সিরিয়া,সৌদি আরব, ইরাক, ইরান এমনকি তুরস্কের কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বে এমন একটি পশ্চিমা বয়ান প্রতিষ্ঠিত আছে যে, যারা ধর্মের জন্য যুদ্ধ করে তারা উগ্রপন্থী, বিশেষ করে এই বয়ানটি নির্মিত হয়েছিল মুসলিমদের জন্য, বিশেষ করে ইরাক ও আফগানস্তান আক্রমনের সময়ে এটি বহুল প্রচারিত ছিল। এর কারণ হল যেন লাস্ট লাইন অব ডিফেন্স বা জনতার একত্রিত প্রতিরোধ ভেঙ্গে যায়। জঙ্গি ! হওয়ার ভয়ে বা সন্দেহে সাধারন মানুষ যেন কোন প্রতিরোধ গরে তুলতে না পারে। এবং তথাকথিত এই উগ্রপন্থা বা সন্ত্রাস নির্মূলে সমগ্র পশ্চিমই শুধু নয় বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রও বিভিন্ন সময়ে অত্যান্ত বর্বর ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একের পর এক মুসলিম দেশগুলোর উপর। হাজার বছরের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল। অথচ তারাই এখন মোটামুটি ঘোষণা দিয়ে ধর্মযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
ওই যে আগে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘কেন’, সেই আলোচনায় ফিরে আসা যাক। যদি এভাবেই যুদ্ধ চলতে থাকে তবে সব চেয়ে বেশী ভুক্তভোগী দেশ হবে মদ্ধপ্রাচ্চ্যের তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ ধনী দেশগুলি। এখানে ইজরাইল ও আমেরিকার উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি নেই। ইজরাইলের জিডিপি নিয়ে তাদের না ভাবলেও চলে, অদৃশ্য কোষাগার থেকে তাদের কাছে অগুনিত টাকার যোগান আসে, আর আমেরিকা তো ধরা ছোয়ার একেবারেই বাইরে, এই যুদ্ধে তার দেশে একটি পটকাও ফুটবে না যদি না তারা নিজেরা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন চালায়। ধারণা করা হয় আমেরিকায় যে পরিমান তেলের মজুদ আছে তা দিয়ে তারা অনায়াসে ১০ -১৫ বছর জ্বালানী চাহিদা মিটিয়ে নিতে পারবে, এছাড়াও তাদের আছে দারুন সব প্রযুক্তি ও আয়ের বিভিন্ন উৎস। কিন্তু মদ্ধপ্রাচ্চের তো তেল-গ্যাস আর অল্প কিছু খনিজের বাইরে তেমন উল্লেখযোগ্য আয়ের উৎস নেই। তারা শুধু ধনীই হয়েছে এর সাথে অন্যের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।
মদ্ধপ্রাচ্চ্যে সৌদি আরবই হলো লিখিত বা অলিখিত নেতা এবং সামরিক সরঞ্জামের হিসাবে শক্তিশালীও বটে। যদি ইরান এই যাত্রা কোনোভাবে উৎরে যায় তবে সৌদির আধিপত্য ভীষণভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে তা বলাই বাহুল্য। আর যদি ইরান হেরে যায় তবে পুরা মদ্ধপ্রাচ্চ্য হেরে যাবে, শেষ হয়ে যাবে তাদের বিলাসী জীবন। একে অপরের তেল-গ্যাসক্ষেত্রের যে ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে তা পুনরায় ঠিক করতে অন্তত ৫ থেকে ৮ বছর সময় লাগবে বলেই আমার ধারণা, আর ব্যয় হবে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন দলার। আর যদি তাই হয়, তাহলে গরিবী যে তাদের চারদিক থেকে চেপে ধরবে তাতে সন্দেহ করার সুযোগ নেই। রাজ-পরিবারগুলো হয়তো আরামে থাকবে কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ এক টানে লাম্বোরগিনি থেকে সোজা উটের পিঠে নেমে আসবে।
ঠিক এই সময়েরই অপেক্ষায় ইজরাইল, তারা তাদের অদৃশ্য ফান্ড থেকে টাকা পাবে আর ‘গ্রেটার ইজরাইল’ প্রতিষ্ঠার কাজ জোড় কদমে চালিয়ে যাবে। এই জায়োনিস্টদের কাছে তখন পুরা মদ্ধপ্রাচ্চ্য খুবই লম্বা সময়ের জন্য গোলামীর শিকলে বাধা পড়বে।
নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণ এশিয়াতে এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। ইরানকে আক্রমণের জল্পনা কল্পনা চলমান সময়ে হটাৎ করেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক সামরিক চুক্তি হয়। প্রায় ঠিক একই সময়ে আফগানস্থান ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষের তিব্রত বাড়ে। যাই হোক, পাক-সৌদি চুক্তির মূল বিষয় হলো ‘সৌদির উপর আক্রমন পাকিস্তান নিজের ভূমির উপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং একই ভাবে সৌদিও পাকিস্তানের উপর আক্রমণ নিজেদের উপর আক্রমণ হিসাবে বিবেচনা করবে’। ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।
বিশেষ করে সৌদি আরবের ভূমি ব্যবহার করে আমেরিকা যদি ইরানকে বার বার আক্রমণ করতে থাকে ইরানও জবাব দিতে থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নাই। আক্রমনের তিব্রতায় সৌদি আরব যদি পাল্টা আঘাত করে বসে তবে সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় অন্নান্য দেশগুলো ইরানে আক্রমণের এক প্রকার বৈধতা পাবে। একে অপরের যথেষ্ট প্রাণ ও সম্পদ নষ্ট করবে কিন্তু বিবাদমান এই দেশগুলোর কেউ লাভবান তো হবেই না বরং কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে।
ইরানের আক্রমনের তীব্রতা অনেক বেড়ে গেলে নিঃসন্দেহে সৌদি আরব তখন পাকিস্তানের সাহায্য চাইবে এবং পাকিস্তান হয়তো তখন ইরানে আক্রমণ করে বসতে পারে। আর এই আক্রমণকে বৈধতা দিতে বিশ্বব্যাপী “শিয়া – সুন্নি” বিভাজনকে উস্কে দেওয়া হবে। পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা মেশিনগুলো একযোগে লাগাতার কাজ করে যাবে এই বিভাজনকে যুক্তিযুক্ত করতে, অবশ্যই বিশ্বকে সভ্যতার সবক দেওয়া পশ্চিমা দুনিয়া চুপ থেকে দেখবে। পাকিস্তান ইরানে আক্রমণ করলে বেশ ভালোই বিপাকে পরে যাবে।
ভারত এই সুযোগের জন্য এক পায়ে দাড়িয়ে আছে, তারা আবার ইজরাইলের পরম বন্ধু, এই দুই বন্ধু আবার পাকিস্তানের ঘোরতর শত্রু। টিটিপি (তেহেরিকি তালেবান পাকিস্তান) ও বিএলএ (বেলুচ লিবারেশন আর্মি) তাদের তৎপরতা বহুগুন বৃদ্ধি করবে। আফগানস্থানও পাকিস্থানের উপর প্রতিশোধমূলক হামলার মাত্রা জোরদার করবে এবং তালেবানকে দুনিয়ার সামনে আবারো জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ সহ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোও অশান্ত হয়ে উঠবে। এই উপমহাদেশ খুবই জটিল এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
তাহলে মধ্যপ্রাচ্চ্যের দেশগুলো এখনো কেন ইরানকে আক্রমণ করছে না ? সম্ভবত এই জন্য যে, তারা এখনো তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করা দেশের কাছ থেকে আক্রমনের ইশারা পায়নি। আমার মনে হয় ইশারা ঠিক তখনই আসবে যখন ইরানকে এই সমস্ত উপসাগরীয় দেশ থেকে আক্রমনে আক্রমণে ব্যাতিবাস্ত করে ফেলা হবে এবং ইরানও প্রতিরোধ মুলক ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাত করবে। ঠিক এই সময়ে পশ্চিমারা দুনিয়ার সামনে বয়ান নিয়ে হাজির হবে, ‘ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’, তারা নিরপরাধ আরব ভুমিতে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে। অথচ, ইজরাইল মার্কিনীদের ঘাড়ে চেপে আরব ভুমি ব্যবহার করে ইরানকে তছনছ করে দিচ্ছে। মজলুমকে জালিম হিসেবে দুনিয়ার সামনে হাজির করা হবে।
মুসলিমদেশগুলো একে অপরের সাথে লড়াই করে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, লোকক্ষয় ও সামরিকভাবে চরম দুর্বল অবস্থায় মার্কিন মুলুক ও ইজরাঈলী গণহত্যাকারীদের সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। নিশ্চই ইজরাইলিরা তখন তাদের সাথে আচরণ করবে ব্যাক্তিত্বহীন পশুর মতো। এখনও তাদের কাছে সময় এবং সুযোগ দুটোই আছে নিজেদের নিরাপত্তা, নিজেদের সম্পদ, নিজেদের অর্থ ব্যাবস্থা নিজেদের মত করে ব্যবহার করার। নিজেদের মুদ্রায় তেল-গ্যাসসহ সকল বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পন্ন করার, নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতিতে পরিণত করার, নিজেদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার। বলা যায়, ঠিক এই সুযোগটি ইরান তাদের জন্য এই মুহূর্তে হাজির করে দিয়েছে।
যদি উপসাগরীয় দেশগুলো এখনই সতর্ক ও সাহসী পদক্ষেপ না নেয় এবং অন্তত এই মুহূর্তে নিজেদের অহংকার একটু পাশে না সরায়, তাহলে আমার বিশ্বাস তারা অন্তহীন দুঃখ-কষ্ট এড়াতে পারবে না। এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে সঠিক কাজ হলো, তাদের অঞ্চলকে আর যুদ্ধের উর্বর ক্ষেত্র বানতে না দেওয়ার দিকে পুরো মনোযোগ দেওয়া। নিজেদের ভালোর জন্যই তাদের এখন অন্তত এই সময়ে আমেরিকাকে স্পষ্ট করে “না” বলতে হবে।
যদি তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই চিন্তিত থাকে, তাহলে তারা অন্য মুসলিম দেশগুলোর সাথে নিরাপত্তা চুক্তি করতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলি “ইউরো”-র মতো নিজেদের একটা সাধারণ মুদ্রাও তৈরি করতে পারে যা তারা ব্যাবহার করবে তেল-গ্যাস সহ সকল বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক বানিজ্যের ক্ষেত্রে। তাহলে আর কোনো পরাশক্তি ‘পেট্রো-মুদ্রা’ নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। ফলে আমেরিকা ও অন্য পরাশক্তিগুলো আরবদের সম্পদের ওপর কোনো বড় ভূমিকা আর রাখতে পারবে না। কোনো ডলার নয়, কোনো ইউরো নয়, কোনো ইয়েনও নয়, শুধু থাকবে সেই মুদ্রা, যেটা উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই তৈরি করবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন দুটো পথ খোলা: হয় তারা অহংকার ছেড়ে সাহসী ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেবে, আমেরিকাকে ‘না’ বলবে, ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করবে, একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট গঠন করে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেরাই করবে এবং একটি স্বাধীন মুদ্রা তৈরি করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করবে। নয়তো চুপচাপ অপেক্ষা করবে যতক্ষণ না ‘গ্রেটার ইজরায়েল’-এর স্বপ্ন পূরণের পথে তাদের সম্পদ, গৌরব ও স্বাধীনতা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।
সময় ফুরিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে যদি তারা জেগে না ওঠে, তাহলে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না, আরব জাতির ভবিষ্যৎ হয়তো শুধু ধ্বংসস্তূপ আর গোলামির শিকলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
