দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্র (ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার বা এনসিটিসি) এর পরিচালক জো কেন্টের পদত্যাগ শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং ওয়াশিংটনের ক্ষমতার রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্য কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে গভীর নীতিগত দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করা একজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার এই সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বড় আদর্শিক সংকেত হিসেবে দেখছেন।
১৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে জো কেন্ট স্পষ্টভাবে জানান, তিনি “সচেতনভাবে” ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সমর্থন করতে পারছেন না। তাঁর মতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক বা সরাসরি হুমকি ছিল না এবং যুদ্ধের পক্ষে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ দ্বারা প্রভাবিত।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন্ট যুদ্ধবিরোধী কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন; বরং তিনি একজন যুদ্ধঅভিজ্ঞ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ফলে তাঁর আপত্তি আদর্শিক নয়, বরং গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এসেছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি পদত্যাগপত্রে ইঙ্গিত দেন যে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি সংঘাতে জড়ানো কমানো, কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো সামরিক নীতিতে ফিরে যাচ্ছে।
১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া জো কেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সেস গ্রিন বেরেট সদস্য হিসেবে ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন এবং পরে সিআইএর প্যারামিলিটারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ তিনি নীতিনির্ধারক হওয়ার আগে যুদ্ধক্ষেত্র ও গোয়েন্দা বাস্তবতা দুই দিকই দেখেছেন।
রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০২২ ও ২০২৪ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলেও জয় পাননি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প তাঁকে এনসিটিসির পরিচালক নিয়োগ দেন এবং সিনেট অল্প ব্যবধানে অনুমোদন দেয়। ফলে তাঁর পদত্যাগকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বাইরের নয়, ভেতরের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পদত্যাগের পর ট্রাম্পের সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “তিনি চলে গেছেন, এটা ভালোই হয়েছে,” প্রশাসনের সঙ্গে কেন্টের সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট করে। হোয়াইট হাউস সূত্র অনুযায়ী, পদত্যাগের আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়, যা নির্দেশ করে সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নয় বরং নীতিগত অচলাবস্থার ফল।
রিপাবলিকান দলের ভেতরে প্রতিক্রিয়া বিভক্ত। একাংশ এটিকে ম্যাগা আন্দোলনের ভেতরে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতবিরোধের প্রকাশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে কিছু রক্ষণশীল বিশ্লেষক কেন্টের বক্তব্যে ইসরাইল নীতির সমালোচনা থাকায় বিতর্ক উসকে দিয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। শুরুতে প্রশাসন দাবি করেছিল ইরান একটি “আসন্ন হুমকি” তৈরি করেছিল, কিন্তু পরবর্তী বক্তব্যে সেই যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে যুদ্ধের বৈধতা ও কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই অবস্থায় জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রধানের পদত্যাগ গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে ফাঁককে সামনে এনে দিয়েছে। ইতিহাস বলছে, ইরাক যুদ্ধের আগেও একই ধরনের গোয়েন্দা বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বড় নীতিগত সংকট তৈরি করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জো কেন্টের পদত্যাগ তিনটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে।
প্রথমত, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেই মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে ঐক্য নেই।
দ্বিতীয়ত, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এখন প্রশ্নের মুখে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বনাম গোয়েন্দা মূল্যায়নের দ্বন্দ্ব আবার দৃশ্যমান হয়েছে।
এই পদত্যাগ কংগ্রেসে নতুন তদন্ত, যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে জনমত বিতর্ক এবং রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে পররাষ্ট্রনীতি পুনর্বিন্যাসের আলোচনা ত্বরান্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি মিত্র দেশগুলোকেও সংকেত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটনের নীতি অভ্যন্তরীণভাবে স্থিতিশীল নয়।
জো কেন্টের পদত্যাগকে ব্যক্তিগত প্রতিবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে চলমান বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন: আমেরিকা কি আবার দীর্ঘমেয়াদি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ফিরছে, নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সেই পথ নির্ধারণ করছে?
একজন যুদ্ধঅভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তার প্রকাশ্য আপত্তি প্রমাণ করে, যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, নীতিনির্ধারণের টেবিলেও লড়া হচ্ছে।
