দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । আহসান উদ্দিন ভূঁইয়া ।
ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে পুলিশের অসৌজন্যমূলক আচরণে নিন্দার ঝড় বইছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত বা দৃষ্টান্তমূলক না হোক, ন্যূনতম শাস্তির আওতায় তো আনা হবে। এই দেশে এই বাহিনীর অপরাধ নিয়ে কথা বলা হয় ব্যাপক, কিন্তু তাতে কখনোই কিচ্ছু আসে যায়নি। ফলে তাদের কলিজা পুরো শরীরের সমান।
আজকে যারা কথা বলছেন, তারা কেউ কেউ কি কখনো এদের দ্বারা হেনস্থা, অপমান বা নির্যাতনের শিকার হননি? বা ভবিষ্যতে হবেন না? এমন অনেক নাঈম প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, জড়িয়ে যাচ্ছেন মিথ্যা মামলায়, হয়ে যাচ্ছেন গুম। অথচ যারা এসব করছে, তাদের দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন করা।
নাঈম হাসান বলেছেন, “আমি ক্রিকেটার বলে বেঁচে গেলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটত?” এই প্রশ্নটি সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে একটি বড় উদ্বেগ প্রকাশ করে। নাঈমের অভিযোগ অনুযায়ী তিনি আশঙ্কা করেছিলেন তাকে গুম করা হতে পারে। কারণ তাকে পুলিশের গাড়িতে না তুলে একটি অটোতে তোলা হয়েছিল। তার চিৎকার শুনে স্থানীয় মানুষ এগিয়ে না এলে আজ হয়তো সে গুম হয়ে যেত বা পরদিন পত্রপত্রিকায় শিরোনাম হতো—‘সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত: ক্রিকেটার নাঈম গ্রেফতার’। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য জনসমক্ষে সহায়তা কামনা করতে বাধ্য হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কতটা বিপদগ্রস্ত—তা স্পষ্ট। নাঈম হাসানের জায়গায় আপনি বা আমি থাকলে অপরাধী না হয়েও দাগী আসামি বনে যেতাম, নিরপরাধ হয়েও দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলে থাকতে হতো, অসংখ্য মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়তাম।
কেননা এই বাহিনীর মামলা বাণিজ্য এবং নিরপরাধকে অপরাধী সাজিয়ে নিজের পোর্টফোলিও ভারী করার পাশাপাশি ভিক্টিমের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ‘ঘুষ’ নেওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাঈমের সঙ্গে ঘটনার ব্যবচ্ছেদে কয়েকটি পুরোনো প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, পুলিশ যে ভাষায় নাঈমের সঙ্গে কথা বলেছে, সেটা কতটা গ্রহণযোগ্য? দ্বিতীয়ত, সন্দেহ হলেই কাউকে শারীরিক নির্যাতনের অধিকার পুলিশের আছে কি? তৃতীয়ত, পুলিশের অপরাধের সঠিক তদন্ত ও বিচারের নিশ্চয়তা কেন হবে না? এবং এত বিতর্ক, এত অপরাধ, এমনকি ২৪-এর জুলাই-আগস্টে এদের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে জনরোষের পরও এই বাহিনীতে কেন সংস্কার নেই?
নাঈম দাবি করেন পুলিশ বলেছে, “তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।” কথা হলো, পুলিশ যে কাউকে ‘তুই’ সম্বোধন করতে পারে কি? আর নাঈমকে—তার সন্দেহ হয়েছে বা তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম নাঈম কোনো দোষের সঙ্গে জড়িত—তাহলেও কি তাকে ‘আসামি’ বলা যাবে? আইন বলে, পুলিশ যদি কাউকে গ্রেপ্তারও করে, পরবর্তীতে তদন্ত শেষে যদি তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়—তখনই কেবল অভিযোগপত্রে যাদের নাম থাকে, তাদের ‘আসামি’ বলা যায়। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত ব্যক্তি ‘নির্দোষ’ হিসেবে গণ্য হন। ফলে যে কাউকে পুলিশের এই ‘আসামি’ সম্বোধন চরম অপমানজনক এবং আইনবিরুদ্ধ আচরণ। কাউকে অপরাধী প্রমাণের আগেই অপরাধীর মতো আচরণ করা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রশ্ন উঠেছে আরেকটি বিষয়ে—পুলিশের সঙ্গে সিভিল পোশাকে একজন ছিল। পুলিশের কথিত সোর্স মোহাম্মদ সোহেল। ওই ব্যক্তিও লাঠি দিয়ে নাঈমকে আঘাত করে। সে কোন ক্ষমতা বা আইন বলে কাউকে আঘাত করতে পারে?
আরেকটি ভাষাগত দিক খুব শ্রুতিকটু এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতি পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের মানদণ্ড হিসেবে সামনে এসেছে। তা হলো, থানায় নেওয়ার পর খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান তাকে বারবার বলেছিলেন, ‘চোখ নিচু করে কথা বলতে।’
থানার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রের কর্মচারী ও নাগরিকের সম্পর্ক হওয়ার কথা সেবাদানকারী ও সেবাগ্রহীতার। সেখানে সেবাদানকারীই যখন সেবাগ্রহীতাকে চোখ নামিয়ে কথা বলতে বলে শাসায়, অপমান করে বা ভয় দেখায়, তখন সে নিজেকে জনগণের সেবক নয় বরং জনগণের ওপর কর্তৃত্বকারী শক্তি হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
পুলিশের ভাষ্যমতে, সোর্স চোরাচালানের তথ্য দিয়েছিল বলেই এই অভিযান। কিন্তু সোর্স তথ্য দিলেই বা পুলিশের সন্দেহ হলেই কাউকে শারীরিক নির্যাতন করতে পারবে? ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ও ৯৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট দলিল বা বস্তু উদ্ধারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি বা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ তল্লাশি করতে পারে। কাউকে সন্দেহ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ বা থানায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, কিন্তু জনসমক্ষে লাঠিচার্জ বা শারীরিক লাঞ্ছনা করা পুলিশের কোড অব কন্ডাক্টের পরিপন্থী। পুলিশের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা, এমনকি ভয় দেখানোও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজের কৃতকর্মের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন এবং তার কৃতকর্মের দায় পুরো বাহিনীর ওপর বর্তাবে না। এই আইনে অপরাধী প্রমাণিত হলে পুলিশ কর্মকর্তা অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ৫ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে এই আইনের প্রয়োগ খুব সীমিত।
অভিযোগ আছে, সাহস করে কেউ মামলা করলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা তার স্বজনেরা পরে চাপে পড়েন, হুমকির মুখে পড়েন, অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়, কখনো কখনো মীমাংসার প্রস্তাব পান।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা পর্যন্ত বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে যতটুকু বলপ্রয়োগ প্রয়োজন (যদি সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে), তার বেশি শক্তি প্রয়োগ করা যাবে না। ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, কোনো স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বা তথ্য বের করার জন্য পুলিশ কোনোভাবেই শারীরিক বা মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে ন
