দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
মার্কিন বাহিনীর পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের পাল্টা জবাবে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরান। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে দুটি মার্কিন জাহাজসহ মোট ১০টি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ছিল। তবে মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে, তাদের কোনো যুদ্ধজাহাজে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ফলে ইরানের দাবি করা জাহাজগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
হামলার পেছনে ইরানের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তারা পাঁচটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছে। এর পরই তেহরান পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসিন রেজাই দাবি করেছেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে একটি নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অস্ত্রটিতে বৈদ্যুতিক ও আলোকভিত্তিক অনুসরণ প্রযুক্তি রয়েছে এবং এটি উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা ছাড়াই লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইরান এর আগে আলোকসংবেদী প্রযুক্তিসম্পন্ন মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করলেও এবারের হামলায় ঠিক কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
জর্ডানেও ইরানের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, দেশটির আল আজরাক এলাকায় অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান দেশটির দিকে ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এর মধ্যে ১৮টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ধ্বংস করা হয়। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। প্রাথমিকভাবে জর্ডান কোনো হতাহতের খবর জানায়নি।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, রাতভর হামলায় বিমানঘাঁটিতে একাধিক মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি এ-১০ যুদ্ধবিমানের একটি ডানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় আটটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানও সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলো পরে আবার ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
ইরানের পাল্টা হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করে। সংঘাতের কারণে ওই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এরই মধ্যে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটি এবং ওই অঞ্চলের তেলবাহী জাহাজগুলোকেও সতর্ক করেছে। ফলে সংঘাত এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন জাহাজ ও সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরানকে আরও কঠোর জবাবের মুখোমুখি হতে হবে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার এই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
