লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের পাঁচ দিনের সফরে যা যা হলো

প্রকাশিত: 27 সেপ্টেম্বর 2026

28 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন তারেক রহমান। পাঁচ দিনের এই সফরে জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশগ্রহণ, একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

সফরের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নিজে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।

জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ

সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফর। সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, আন্তর্জাতিক শান্তি, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরেন।

সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের বিষয় ছিল—দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসান, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং টেকসই সমাধান।

প্রধানমন্ত্রী সেখানে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে এটি পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

সাতটি বক্তব্য, ৩০ কর্মসূচি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সফরকালে তারেক রহমান ১১টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এবং মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে—

  • বাণিজ্য ও বিনিয়োগ।

  • জনশক্তি রপ্তানি।

  • জ্বালানি নিরাপত্তা।

  • আঞ্চলিক সহযোগিতা।

  • রোহিঙ্গা সংকট।

  • স্বাস্থ্য ও জলবায়ু।

  • আন্তর্জাতিক শান্তি।

  • জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধি।

সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি বক্তব্য দেন। এর মধ্যে সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনের ভাষণ ছাড়াও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চারটি, বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে একটি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের একটি অনুষ্ঠানে একটি বক্তব্য দেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক

তারেক রহমান কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এসব বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় আলোচিত হয়।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

বোয়িংয়ের ১১টি উড়োজাহাজ

প্রধানমন্ত্রীর সফরের শুরুতেই রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের মধ্যে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ চুক্তিকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনা করেই উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে চুক্তিটির আর্থিক মূল্য, সরবরাহের সময়সূচি, অর্থ পরিশোধের কাঠামো এবং বিমানের ধরন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। এদিকে দেশের অর্থনৈতিক চাপের সময়ে বিপুল ব্যয়ে নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক—এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আরেকটি চুক্তির কথা জানানো হয়েছিল।

বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা

সফরের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পক্ষে এতে স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি-বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ।

বাংলাদেশে রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। নতুন সমঝোতার আওতায় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কী হবে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ

তারেক রহমানের সফর চলাকালে নিউইয়র্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা শেখ হাসিনা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন। অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিং হওয়ায় কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত ওই ব্রিফিংয়ে বলা হয়, শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আশা করে, বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এ বিষয়ে একটি সমাধানে পৌঁছাবে।

বক্তব্যে বলা হয়, শেখ হাসিনা ইস্যুটি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা অবস্থান এখনো জানায়নি।

সফরের মূল্যায়ন

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার উঠে এসেছে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—দুই পক্ষকে লক্ষ্য করেই বক্তব্য দিয়েছেন।

আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন এবং বাংলাদেশ কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে, তা স্পষ্ট করেছেন। তাঁর মতে, কয়েক মাস বয়সী সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে এ ধরনের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সফরের অর্জন মূল্যায়নের জন্য বোয়িং চুক্তির আর্থিক কাঠামো, পারমাণবিক সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ফলাফল আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তারেক রহমানের পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফরে কূটনৈতিক যোগাযোগ, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জনশক্তি রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে। একই সময়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সমঝোতা সফরটিকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।

তবে এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা, বাস্তবায়ন, আর্থিক দায় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যের ওপর।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman