দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা শুধুমাত্র মাঠের খেলার জন্য নয়, বরং বিতর্ক, রহস্য এবং নৈতিক প্রশ্নের কারণেও আজও আলোচিত। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচের তথাকথিত ‘পবিত্র পানি’ বা ‘হোলি ওয়াটার’ কেলেঙ্কারি সেই তালিকার অন্যতম শীর্ষে।
ইতালির তুরিনের স্তাদিও দেলে আলপিতে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর নক আউট ম্যাচে শুরু থেকেই আধিপত্য ছিল ব্রাজিলের। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না সেলেসাওরা। ম্যাচের এক পর্যায়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ব্রাজিলের লেফট ব্যাক ব্রাঙ্কো আর্জেন্টিনার বেঞ্চের কাছ থেকে একটি পানির বোতল নিয়ে পান করেন।
ব্রাঙ্কোর দাবি অনুযায়ী, সেই পানি পান করার কিছুক্ষণ পর তিনি অস্বাভাবিক মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং দিকভ্রান্তির মতো উপসর্গ অনুভব করতে শুরু করেন। পরে তিনি অভিযোগ করেন, বোতলটিতে চেতনানাশক বা ঘুমের ওষুধ মেশানো ছিল, যার প্রভাব মাঠেই অনুভব করেছিলেন এবং ম্যারাডোনাকে মার্ক করতে পারছিলেননা ঠিক মতো।
ম্যাচের ৮১তম মিনিটে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক দিয়াগো ম্যারাডোনা। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে কয়েকজন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়কে কাটিয়ে তিনি নিখুঁত পাস দেন ক্লাউদিও ক্যানিজিয়াকে। ক্যানিজিয়া গোলরক্ষককে পাশ কাটিয়ে বল জালে জড়িয়ে দিলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল বিদায় নেয় টুর্নামেন্ট থেকে।
ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি গুজব, অভিযোগ এবং ফুটবল কিংবদন্তির অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে আর্জেন্টিনার একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ম্যারাডোনা বিস্ফোরক মন্তব্য করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার বেঞ্চ থেকে দেওয়া ওই বোতলে ‘রোহিপনল’ নামের একটি চেতনা-নাশক ওষুধ মেশানো হয়েছিল এবং ব্রাঙ্কো সেটি পান করেছিলেন। পরে ২০০৫ সালেও তিনি একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আর্জেন্টিনা ফুটবল কর্তৃপক্ষ কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলবার্দো বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্ট মন্তব্য করলেও সরাসরি নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে ব্রাঙ্কো বহুবার বলেছেন, তিনি ম্যাচের সময় নিজেকে মাতাল মানুষের মতো অনুভব করেছিলেন। ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ সেবাস্তিয়াও লাজারোনিও পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে বিরতির সময় ব্রাঙ্কোকে বদলি না করা তার ভুল ছিল।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত আলোচিত ঘটনা হওয়া সত্ত্বেও ফিফা কখনও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক শাস্তি দেয়নি এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি। ফলে ‘হোলি ওয়াটার’ কেলেঙ্কারি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং রহস্যঘেরা ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সূত্র: এল পাইস, এএনএসএ, ইউওএল এস্পোর্তে, হাউলার ম্যাগাজিন, ইনফোবায়ে, টিওয়াইসি স্পোর্তস, কুপেরাতিভা।
