লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে কতটা অর্থনৈতিক চাপে ইরান?

প্রকাশিত: 07 সেপ্টেম্বর 2026

35 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে অর্থনীতি সচল রাখার চেষ্টা করেছে ইরান। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে তেহরান এখন এমন এক অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের দরকষাকষির কৌশলকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও কঠোরতর নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। মার্চে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে আগস্টে ইরানের অপরিশোধিত তেল উত্তোলন ও জাহাজে তোলার পরিমাণ কমে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫৫ হাজার ব্যারেলে নেমেছে। এর ফলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

এই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এপ্রিলের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে ইরানের গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বেকারত্ব ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। জুলাইয়ের হালনাগাদ মূল্যায়নে সংস্থাটি ইরানের অর্থনীতি চলতি বছর ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাসও দিয়েছিল।

অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও ইরান এখনো সম্পূর্ণভাবে পিছু হটার কোনো স্পষ্ট সংকেত দেয়নি। বরং দেশটির কর্মকর্তারা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার কথা বলছেন। ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ নিষেধাজ্ঞার কারণে সরকারের নীতিগত অবস্থান বদলানোর ধারণা প্রত্যাখ্যান করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবাহিত হতো, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলেও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার করে ক্ষতির একটি অংশ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

এখানেই ইরানের দরকষাকষির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজার বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুত এবং নতুন পরিবহনপথের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে প্রণালির ওপর চাপ তৈরির হুমকি আগের মতো কার্যকর থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

তবে ইরানের হাতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা চাপ তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা এবং নতুন নৌ চলাচলপথের মানচিত্র প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জাহাজ ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলাও হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়ছে, সামরিক উত্তেজনাও ততটাই বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বিশ্ববাজারও পুরোপুরি চাপমুক্ত নয়। ৭ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯৬ ডলার ১৯ সেন্টে উঠেছে। আগের সপ্তাহে ব্রেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম যথাক্রমে প্রায় ৮ ও ১০ শতাংশ বেড়েছিল। গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজে হামলা আরও বাড়লে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে নিঃসন্দেহে দুর্বল করছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তেহরান তার সব কৌশলগত ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বরং পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দুই পক্ষই ক্ষতির হিসাব করছে। ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে আলোচনায় concessions দিতে বাধ্য করতে চাইছে। অন্যদিকে তেহরান নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে নিজের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

এই অচলাবস্থা ভাঙতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা চলছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করার বিনিময়ে ইরানের কিছু দাবি পুনর্বিবেচনা কিংবা প্রণালির ব্যবহার ঘিরে ফি আদায়ের বিষয়ে সমঝোতার ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে এখনো কোনো কার্যকর চুক্তির লক্ষণ স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে ইরানের অর্থনৈতিক চাপ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গভীর। তেল রপ্তানি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি তেহরানের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়াচ্ছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দেশটিকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ দরকষাকষির অবস্থানে রেখেছে। ফলে ইরান সত্যিই তার কৌশলগত প্রভাব হারাচ্ছে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে আগামী দিনের তেল রপ্তানি, হরমুজের নৌ চলাচল এবং কূটনৈতিক আলোচনায় দুই পক্ষের ছাড় দেওয়ার ওপর।

 

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman