দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী একাধিক স্থানে চীনা সেনাদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান চলছে বলে জানিয়েছেন ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর। তাঁর বক্তব্যে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত জুলাইয়ে তাকসিং এলাকায় উত্তেজনার পর দুই দেশের সেনাদের মধ্যে একাধিক স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাজস্থানের আলওয়ারে বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে কাপুর বলেন, অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি স্থানে সম্প্রতি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছিল এবং কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। তিনি এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় মোতায়েন করা বাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘শৌর্য’ কমান্ডো দলের ভূমিকার প্রশংসা করেন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তাঁর বক্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশের তাকসিং এলাকায় টহল কার্যক্রম ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচলের ওয়াচা-দামাই সীমান্ত বৈঠকস্থলে দুই দেশের কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এসব আলোচনার পরও সীমান্তের কয়েকটি স্থানে মুখোমুখি অবস্থান অব্যাহত রয়েছে বলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান জানিয়েছেন।
চীনের সঙ্গে সীমান্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করার কথা জানিয়েছেন কাপুর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের সীমান্তবর্তী সব ইউনিটে ড্রোন পরিচালনার জন্য বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় নতুন যুদ্ধ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো নির্মাণের কাজও চলছে।
বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাটালিয়নে একটি করে ‘শৌর্য’ কমান্ডো দল গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রতিটি ব্যাটালিয়নে পূর্ণাঙ্গ কমান্ডো কোম্পানি এবং বিশেষ অভিযানের জন্য আলাদা ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধের উপযোগী বিশেষ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রাণহানি ঘটে। ওই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি হয়। পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা কমাতে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত নিয়েও দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার অবস্থান সম্পর্কে দুই দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে বিভিন্ন সময়ে টহল ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানের নির্দিষ্ট স্থান, ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কিংবা কোনো পক্ষের হতাহতের তথ্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের বক্তব্যে প্রকাশ করা হয়নি।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করেছে। দলের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের অভিযোগ, অরুণাচলে সীমান্ত পরিস্থিতি, টহল এলাকায় প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ, চীনের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন এবং বড় বাঁধ নির্মাণের মতো বিষয়গুলোতে সরকারকে আরও স্পষ্ট অবস্থান জানাতে হবে।
রমেশের দাবি, সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা উদ্বেগজনক। তিনি ভারত-চীন বাণিজ্য ঘাটতি এবং চীনের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব বক্তব্য বিরোধী দলের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যেও ভারত ও চীন আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের বক্তব্য দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত না হওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে সীমান্তে বাহিনীগুলোর অবস্থান, সামরিক যোগাযোগ এবং চলমান কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
