লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার অমর দিন এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা

প্রকাশিত: 01 মে 2026

69 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

প্রতি বছর ১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস। এই দিনটি শুধু ছুটির দিন নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার লড়াইয়ের প্রতীক। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হে মার্কেট স্কয়ারে শ্রমিকদের যে ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তারই স্মরণে আজও বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালিত হয়।

১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে আমেরিকায় শ্রমিকদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, মজুরি ছিল নামমাত্র এবং কাজের পরিবেশ ছিল বিপজ্জনক। ১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগোসহ বিভিন্ন শহরে লক্ষাধিক শ্রমিক ‘আট ঘণ্টার কাজ, আট ঘণ্টার বিশ্রাম, আট ঘণ্টার বিনোদন’—এই স্লোগানে রাস্তায় নেমে আসেন।

৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে এক সমাবেশ চলাকালীন এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ছোড়া বোমায় পুলিশসহ কয়েকজন নিহত হন। এ ঘটনায় আটজন শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে চারজনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এই নৃশংস ঘটনা বিশ্বব্যাপী শ্রমিক আন্দোলনকে নতুন গতি দেয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সম্মেলনে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে শ্রমিকের বাস্তবতা

বাংলাদেশে মে দিবস জাতীয় ছুটির দিন। তবে দেশের অধিকাংশ শ্রমিকের জীবন এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে (আরএমজি) প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী। ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ওভারটাইমের ন্যায্য পাওনা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এখনো অনেক ক্ষেত্রে অপূর্ণ রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের ঘটনায় শত শত শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। রানা প্লাজা ধস (২০১৩) এখনো দেশের শ্রমিক আন্দোলনের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে আছে। এছাড়া নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, রিকশা-ভ্যান চালক, গৃহকর্মীসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি শ্রমিক এখনো সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকা অপরিসীম। ২০২৫ সালে তারা দেশে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। অথচ বিদেশে যাওয়ার পথে দালালদের হয়রানি, উচ্চ ফি, অমানবিক পরিবেশ এবং ফিরে আসার পরেও নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাদের।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু গার্মেন্টস বা কায়িক পরিশ্রমে খেটে খাওয়া শ্রমিকই নয়, বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রাইভেট সেক্টরেও এই বৈষম্য খুবই স্পষ্ট। এখানে কর্মঘন্টা বেশি মজুরি বা বেতন কম। কর্মীদের বেতনের বা মজুরির জন্য নির্ধারিত সরকারি বিধিমালা থাকলেও প্রায় কোনো প্রতিষ্ঠানই তা যথাযথ অনুসরণ করেনা, বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি প্রদান করা হয় না। দেশের বাজারে চাকুরী সংকট থাকায় শ্রমিক বা কর্মচারীরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই অন্যায্য বেতন বা মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন।

আজকের বাংলাদেশে মে দিবসের তাৎপর্য আরও বেশি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, এআই ও অটোমেশনের যুগে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

শ্রমিকই জাতির মেরুদণ্ড। তাদের মেধা, ঘাম ও পরিশ্রমেই দেশ এগিয়ে চলেছে। মে দিবস শুধু স্মরণ নয়, বরং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের দিন।

এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত— একটি ন্যায্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক শ্রমিক তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাবেন। শ্রমিকের অধিকারই দেশের অগ্রগতির চাবিকাঠি।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman