দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে। শনিবার তিনি বলেন, রোববারই ইরানে হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। ফলে কূটনৈতিক সমাধান নাকি নতুন সামরিক অভিযান, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বেড়েছে।
ফ্লোরিডায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানে নতুন করে হামলা চালাবে। প্রশ্নটিকে ‘বোকামিপূর্ণ’ বলে উড়িয়ে দিলেও তিনি স্পষ্টভাবে জানান, হামলার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।
ট্রাম্প বলেন, “হয়তো আগামীকালই হামলা হতে পারে। আবার চমৎকার, বড় ও সুন্দর একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তারা চুক্তি করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা চুক্তির শর্ত মেনে চলবে কি না।”
‘আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি’র হুমকি
শুক্রবার ফ্লোরিডার এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি’ অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। ‘এপিক ফিউরি’ নামেই গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল, যা মধ্যপ্রাচ্যে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের সূচনা করে।
তিনি বলেন, “আমরা আরেকটি ছোট্ট এপিক ফিউরি চালাতে পারি, অথবা তারা সমঝোতায় রাজি হবে।” তবে হামলার সময় বা পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের আগে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক বলেছিলেন, এই সপ্তাহান্তেই ইরানে হামলা হতে পারে। তিনি বলেন, “এই সপ্তাহান্তে হামলা হতে পারে কি না? অবশ্যই হতে পারে।” তবে ট্রাম্প পরে বলেন, এমন কোনো পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
যুদ্ধের পেছনের ইতিহাস
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
পরে গত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফার একটি সাময়িক চুক্তিতে সই করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল পুনরায় শুরু, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরি বা সংগ্রহ না করার অঙ্গীকার করে। বিনিময়ে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রাখা হয়।
চুক্তি ভেঙে ফের উত্তেজনা শুরু
কিন্তু ৮ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, চুক্তিটি ‘শেষ’ হয়ে গেছে। এর এক সপ্তাহ পর ইরানও সমঝোতা স্মারক স্থগিত করে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ আনে। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা দীর্ঘ অচলাবস্থায় পড়ে।
ইরানের পাকিস্তানে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম জানিয়েছেন, তেহরান এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে রাজি। তবে তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ইরানি বন্দরে অবরোধ বহাল রাখার কারণে প্রস্তাবটি এগোয়নি।
আঞ্চলিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে
ইরানের কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, নতুন কোনো হামলা হলে তারা আরও শক্তিশালী জবাব দেবে। দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আক্রমণ চালালে ইরান উপসাগরের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল লক্ষ্য করে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সরকার পরিবর্তনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচন এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা একসঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ট্রাম্প আগে বলেছিলেন, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা হবে না। কিন্তু তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যে সেই অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে কূটনীতি জয়ী হবে নাকি অঞ্চলটি আবার যুদ্ধের দিকে এগোবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সমাজ।
সূত্রঃ রয়টার্স
