দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, জ্বালানি, বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সিঙ্গাপুর সফরে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মঙ্গলবার সিঙ্গাপুর সরকারের আমন্ত্রণে সফররত শামা ওবায়েদ ইসলাম দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঝুলকারনাইম আবদুল রহিমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। ২০২২ সালে দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদারে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ করতে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, সিরামিক, কৃষিপণ্য ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, গবেষণা এবং অন্যান্য অবকাঠামো খাতে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ আহ্বান জানান তিনি।
দুই দেশের মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, বাংলাদেশি নার্সদের কর্মসংস্থানের সুযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পানি নিরাপত্তা, কার্বন সনদ, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য সিঙ্গাপুরে আরও দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও সাম্প্রতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সফরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন। সেখানে আঞ্চলিক প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট এনজির সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বে টার্মিনাল প্রকল্পে সিঙ্গাপুরের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের আগ্রহ নতুন নয়। চলতি বছরের মে মাসে সিঙ্গাপুরের পক্ষ থেকে বে টার্মিনালে প্রায় ৮০ কোটি থেকে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছিল।
সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন অবকাঠামোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যেও বন্দর পরিচালনা, নৌপথ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক সামুদ্রিক অবকাঠামোর বিস্তৃত সক্ষমতার চিত্র পাওয়া যায়।
সফরকালে শামা ওবায়েদ সিঙ্গাপুরের তুয়াস বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রও পরিদর্শন করেন। সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও জ্বালানি উৎপাদনে দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও বৈঠকের আলোচনায় স্থান পায়। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে সিঙ্গাপুরের সহযোগিতা চেয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা এবং সংলাপ সহযোগী হওয়ার ক্ষেত্রেও সিঙ্গাপুরের সমর্থন প্রত্যাশা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বৈঠকগুলোতে উভয় পক্ষই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি, জ্বালানি, পরিবেশ ও অবকাঠামো সহযোগিতাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
