দ্য সিভিলিয়ানস । যুগের গল্প ।
“এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক নকশা।
দোমিঙ্গো সারমিয়েন্তো আর হুয়ান বাউতিস্তা আলবের্দির মতো
চিন্তাবিদ-রাজনীতিবিদরা বিশ্বাস করতেন, আর্জেন্টিনাকে
“বর্বরতা” থেকে দূরে সরিয়ে ইউরোপীয় “সভ্যতার” কাছাকাছি
নিয়ে যেতে হবে। তাদের কাছে কৃষ্ণাঙ্গ আর আদিবাসী—দুটোই
ছিল সেই “বর্বরতার” প্রতীক, যা মুছে ফেলতে হবে একটা নতুন,
সাদা জাতীয় পরিচয় গড়ার জন্য।“
আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের গল্পটা আসলে একটা ধীরগতির মৃত্যুর গল্প, কোনো একদিন হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, বরং তিনশ বছর ধরে একটু একটু করে মুছে ফেলার এক নিখুঁত পরিকল্পনা। চলুন গভীরে যাই।
গল্পটা শুরু হয় ১৫৮৮ সালে, যখন রিও দে লা প্লাতা উপনিবেশে প্রথম আফ্রিকান দাসদের আনা হয়। স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা প্রথমে চেষ্টা করেছিল স্থানীয় আদিবাসীদের জোর করে খাটাতে, কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে এনে দাস বানানোর নিষ্ঠুর পথ বেছে নেয়। বুয়েনস আইরেসের বন্দর হয়ে ওঠে দাস ব্যবসার একটি বড় কেন্দ্র, বিশেষত ইংরেজ বণিকদের জন্য শহরটির দুয়ার খুলে দেওয়ার পর। এই মানুষগুলোকে জাহাজের খোলের অন্ধকারে সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়, আর যারা বেঁচে পৌঁছাতেন, তাদের ঠেলে দেওয়া হতো কৃষিক্ষেত্র আর গবাদিপশুর খামারে, যেখানে তাদের শ্রম ছিল অর্থনীতির মেরুদণ্ড, অথচ তাদের অস্তিত্বকে রাখা হতো ইতিহাসের পাদটীকায়, প্রায় অদৃশ্য করে।
তবু এই অন্ধকারের মধ্যেও তারা নিজেদের একটা জগৎ তৈরি করেছিলেন। কঙ্গো, আঙ্গোলা থেকে আসা এই মানুষগুলো তাদের নিজেদের গোত্র ও অঞ্চলের নামে সংগঠন গড়ে তুলতেন, আর সপ্তাহান্তে জড়ো হতেন “কান্দোম্বে” নামের এক নাচ-গানের উৎসবে। এই কান্দোম্বেই ছিল তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস, নিজেদের হারানো আফ্রিকা মহাদেশকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার এক আচার। ঢোলের তালে তালে তারা যেন প্রতিবার নিজের শিকড়ে ফিরে যেতেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি, জুয়ান মানুয়েল দে রোসাসের শাসনামলে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য এক ধরনের অস্বাভাবিক স্বীকৃতি এসেছিল। রোসাস নিজে এবং তার মেয়ে মানুয়েলা কান্দোম্বে অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, উৎসাহ দিতেন। কিন্তু এই ভালোবাসা নিখাদ ছিল না, ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন, রোসাস আসলে রাজনৈতিক সমর্থন আর সেনাবাহিনীর জন্য মানুষ দরকার ছিল বলেই কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সখ্য গড়েছিলেন। ভালোবাসা আর প্রয়োজনের এই মিশ্রণ ছিল বিপজ্জনক, কারণ যখন প্রয়োজন ফুরাল, ভালোবাসাও উবে গেল।
কাসেরোসের যুদ্ধে রোসাসের পরাজয়ের পর সব বদলে যায়। বুয়েনস আইরেস দ্রুত এক গভীর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে শুরু করে, যেখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতির ওপর জোর বাড়তে থাকে। কৃষ্ণাঙ্গরা বুঝে যান, প্রকাশ্যে নিজেদের সংস্কৃতি পালন করা এখন আর নিরাপদ নয়। তাই তারা কান্দোম্বেকে সরিয়ে নেন ঘরের ভেতরে, লুকিয়ে, আর ঠিক এই সময় থেকেই সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতিবিদরা এক নতুন আখ্যান তৈরি করতে শুরু করেন: কৃষ্ণাঙ্গরা নাকি এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, প্রকৃতির নিয়মেই। অথচ বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাদের সংস্কৃতিকে জোর করে অদৃশ্য করা হচ্ছিল, আর সেই জবরদস্তিকেই “স্বাভাবিক বিলুপ্তি” নাম দিয়ে ইতিহাসে লেখা হচ্ছিল।
স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি সংঘাতে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের জোর করে সামনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হতো। প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ছয় বছরের যুদ্ধ (১৮৬৪-৭০) ছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায়, এই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একটা প্রজন্মের পুরুষ হারিয়ে গেলে কী ঘটে? নারীদের বিয়ে করার মতো পুরুষ থাকে না নিজেদের সম্প্রদায়ে, সন্তান জন্মের হার কমে যায়, পরিবার গঠনের চক্রই ভেঙে পড়ে। এভাবেই একটা যুদ্ধ শুধু সৈনিক মারে না, একটা জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই মুছে দেয়।
যারা যুদ্ধ থেকে ফিরতে পেরেছিলেন কিংবা যুদ্ধে যাননি, তাদের ঠেলে দেওয়া হয় শহরের বাইরে, জলাভূমি আর নোংরা বস্তির দিকে। সেখানে অপরিচ্ছন্ন পানি, ঘিঞ্জি ঘর আর অপুষ্টির মধ্যে যখন কলেরা কিংবা বসন্তের মহামারি আঘাত হানে, তখন সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় তাদেরই মধ্যে। রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দেয়নি, দিয়েছিল শুধু প্রান্তিকতা।
১৮৮৭ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, বুয়েনস আইরেসে কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশে, আর তারপর থেকে আদমশুমারির ক্যাটাগরি থেকেই “কৃষ্ণাঙ্গ” শব্দটা সরিয়ে ফেলে তার জায়গায় বসানো হয় অস্পষ্ট শব্দ “ত্রিগেনিও” (গমের রঙের)। ভাবুন একবার, একটা জাতি তার আদমশুমারি থেকেই একটা রঙের অস্তিত্ব মুছে দিল, যেন কাগজ থেকে মুছে ফেললেই বাস্তবতাও মুছে যায়। এক নৃতত্ত্ববিদ পরে মন্তব্য করেছিলেন, আর্জেন্টিনার সাধারণ জ্ঞানের অংশ হয়ে গিয়েছিল যে দেশে কৃষ্ণাঙ্গ বলে কিছু নেই, তাদের গোটা সংস্কৃতিই নাকি উনিশ শতকের শেষেই হারিয়ে গেছে, অথচ এটা ছিল একটা মিথ্যা।
এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক নকশা। দোমিঙ্গো সারমিয়েন্তো আর হুয়ান বাউতিস্তা আলবের্দির মতো চিন্তাবিদ-রাজনীতিবিদরা বিশ্বাস করতেন, আর্জেন্টিনাকে “বর্বরতা” থেকে দূরে সরিয়ে ইউরোপীয় “সভ্যতার” কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে। তাদের কাছে কৃষ্ণাঙ্গ আর আদিবাসী—দুটোই ছিল সেই “বর্বরতার” প্রতীক, যা মুছে ফেলতে হবে একটা নতুন, সাদা জাতীয় পরিচয় গড়ার জন্য। তাই সরকার ইউরোপ থেকে শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের আসার জন্য দরজা খুলে দেয় হাট করে—লাখ লাখ ইতালীয়, স্প্যানিশ অভিবাসীর ঢল আসে, যা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ ও আদিবাসী জনসংখ্যার অনুপাতকে তুচ্ছ করে দেয়। এভাবেই জন্ম নেয় শ্বেতাঙ্গ আর্জেন্টাইনদের গল্প, “আর্জেন্টাইনরা জাহাজ থেকে নেমেছে,” যেন এই মাটিতে ইউরোপ ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না।
যে অল্প কিছু মানুষ এই সব সংকট পেরিয়ে বেঁচে ছিলেন, তাদের সামনে সমাজ একটাই বার্তা দিয়েছিল, কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় মানেই লজ্জা, মানেই পশ্চাৎপদতা। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা মিশ্র বিবাহের মধ্য দিয়ে নিজেদের “সাদা” করে তোলার চেষ্টা করেছেন। এটা কোনো স্বাভাবিক আত্তীকরণ ছিল না, এটা ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়, নিজের অতীতকে অস্বীকার করে বর্তমানে টিকে থাকার এক করুণ কৌশল। একজন মানুষ যখন নিজের চেহারার সাথে জড়িত ইতিহাসকে ঘৃণা করতে বাধ্য হন, তার চেয়ে গভীর ক্ষত বোধহয় আর কিছু হতে পারে না।
কিন্তু গল্পটা সম্পূর্ণ ধ্বংসের নয়। ২০০৫ সালের এক পরীক্ষামূলক আদমশুমারিতে অনুমান করা হয়, জাতীয় জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশের মধ্যে আফ্রিকান বংশধারা আছে, সংখ্যায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ। রক্তে, জিনে তারা রয়ে গেছেন, যদিও পরিচয়ে হারিয়ে গেছেন। আর কান্দোম্বে, সেই প্রাচীন ঢোল- বাদ্য আর নাচ, কখনো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। করিয়েন্তেস প্রদেশে আজও “সান বালতাজার” উৎসবে সেই ছন্দ বাজে, যদিও যারা নাচেন তাদের মধ্যে দৃশ্যমান কৃষ্ণাঙ্গ মুখ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এমনকি তাঙ্গো, যাকে আজ সারা বিশ্ব আর্জেন্টিনার আত্মা বলে জানে, তারও শিকড় লুকিয়ে আছে এই কান্দোম্বে আর মিলোঙ্গার মধ্যে, এক কৃষ্ণাঙ্গ উত্তরাধিকার, যাকে সময়ের সঙ্গে সাদা করে বিক্রি করা হয়েছে বিশ্বের কাছে।
আজও যারা টিকে আছেন, তাদের জন্য জীবনটা সহজ নয়। গায়ের রং একটু গাঢ় হলেই তাদের ডাকা হয় “নেগ্রো”, এমন একটা শব্দে, যা মূলত অবজ্ঞা্, তা তিনি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হোন, আদিবাসী হোন বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসী। নাইটক্লাবের দরজায় তাদের আটকানো হয়, রাস্তায় পুলিশ অকারণে থামায়। এক আফ্রো-আর্জেন্টাইন সংগঠনের নেতারা বলেছেন, এই আচরণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা একটা গোটা জাতির ইতিহাসের সাথে জড়িত এক ধারাবাহিক অন্যায়ের প্রতিফলন।
একটা জাতি যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শুধু ইউরোপীয় বলে দেখতে চায়, তখন সে আসলে নিজের অতীতের একটা অংশকে হত্যা করে। আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের গল্প তাই শুধু তাদের একার গল্প নয়, এটা প্রতিটি জাতির জন্য একটা সতর্কবার্তা, যে ইতিহাস মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তার ক্ষত কখনো সম্পূর্ণ মুছে যায় না। রক্তের মধ্যে, সংস্কৃতির ছন্দে, একটা উৎসবের ঢোলবাদনে, তারা এখনও আছেন, শুধু নাম বদলে, পরিচয় বদলে, নীরবে।
