দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর ১৭ নভেম্বরের রায়ে সাবেক স্বৈরশাষক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও দমন-পীড়নের অভিযোগে আনীত মামলায় ফাঁসির রায় শুনিয়েছে। সে পলাতক থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই এই মৃত্যুদন্ডের রায় দেওয়া হয়েছে।
এই রায়টি বিশ্বব্যাপী এখন খবরের শিরোনাম, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রায়ের ফলে হাসিনার সহ-অভিযুক্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪-এর আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়, যার অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। এই রিপোর্টে বিদেশী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান প্রতিবেদনগুলো সংকলিত হয়েছে, যাতে করে বোঝা যাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গন বিষয়টিকে কিভাবে দেখছে।
রয়টার্স-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনা তিনটি দোষে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন: উস্কানিমূলক নির্দেশ, হত্যার নির্দেশ দেওয়া এবং অত্যাচার রোধে ব্যর্থতা। বিচারক গোলাম মর্তুজা মজুমদার বলেন, “আমরা তার জন্য শুধুমাত্র একটি শাস্তি নির্ধারণ করেছি, তা হলো মৃত্যুদণ্ড।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আদালতে রায় শুনে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো উল্লাস করে উঠেছে এবং বাইরে জনতার ভীড় অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির প্রার্থনা করছিল।”
আল জাজিরার রিপোর্ট অনুসারে, হাসিনা পাঁচটি দোষে দোষী, যার মধ্যে ড্রোন, হেলিকপ্টার দিয়ে হামলা এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রের মাধ্যমে মারাত্মক বল প্রয়োগের নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত। প্রমাণস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, ৯৩টি প্রদর্শনী এবং ৮০-এর বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপিত হয়েছে, যার মধ্যে হাসিনার গোপন অডিও রেকর্ডিংও রয়েছে, যেখানে তিনি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। আল জাজিরায় স্বাধীন গবেষক আব্বাস ফাইজ বলেছেন, “এটি একটি পরিষ্কার বিচার প্রক্রিয়া দেখিয়েছে এবং জাতীয় ঐক্যের পথ খুলেছে।” নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির হাসান মাহমুদ বলেছেন, “এটি হাসিনা-পরবর্তী যুগের প্রথম প্রধান ট্রানজিশনাল বিচারের মুহূর্ত, যা যুবকদের জন্য প্রতীকী।”
নিউ ইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে, এটি ৪৫৩ পৃষ্ঠার বিচারকার্যের ফল, যা ২০১০ সালে হাসিনার নিজের গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়, ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের জন্য।
বিবিসি জানিয়েছে, হাসিনা ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় রায় প্রাপ্ত হয়েছেন এবং তাঁর আইনজীবী মোহাম্মদ আমির হোসেন বলেছেন, “আমি দুঃখিত, এটি (রায়) ভিন্ন হলে ভালো হতো, কিন্তু তাঁর (হাসিনার) অনুপস্থিতিতে আপিল সম্ভব নয়।”
ভারতীয় মিডিয়া ভারত সরকারের সতর্ক প্রতিক্রিয়ার উপর জোর দিয়েছে। দ্য হিন্দু-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এমইএ) জানিয়েছে, “ভারত বাংলাদেশের মানুষের সর্বোত্তম স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যোগাযোগ করবে।”
হিন্দুস্তান টাইমসে বলা হয়েছে, ভারত ২০১৩-এর অপরাধী হস্তান্তর চুক্তির “রাজনৈতিক অপরাধ” ধারা ব্যবহার করে হস্তান্তর প্রত্যাখ্যান করতে পারে, কারণ হাসিনার আমলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। ফার্স্টপোস্ট এবং এনডিটিভি বিশ্লেষণ করেছে, ভারতের “ওয়েট অ্যান্ড সি” নীতি অবলম্বন করবে যতক্ষণ না ২০২৬-এর নির্বাচন হয়।
ভারতের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস নেতা শশী থারুর বলেছেন, “আমি মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, এটি আমার ব্যক্তিগত মতামত।” টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, “সকল বাঙালি এর বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তুলবে।”
মিন্ট-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রায়টি (ভারত-বাংলাদেশ) সম্পর্ককে জটিল করবে, কারণ হাসিনা-ভারত বন্ধু ছিলেন, কিন্তু ভারতের কৌশলগত স্বার্থ (যেমন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা) প্রাধান্য পাবে।
আল জাজিরায় জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেছেন, “কোনো কারণেই ভারত তাঁকে এক্সট্রাডিট (অপরাধী হস্তান্তর) করবে না।” চ্যাথাম হাউসের চিয়েতিগজ বাজপাই বলেছেন, “নয়াদিল্লি ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতি গ্রহণ করেছে যতক্ষণ না ২০২৬-এর নির্বাচন হয়।”
জার্মান ইনস্টিটিউটের (GIGA)-এর রিসার্চ ফেলো ইশরাত হোসেন বলেছেন, “রায়টি অপরাধী হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের হাত শক্ত করেছে এবং জবাবদিহিতার সংকেত দিয়েছে।”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান যিনি ICG-এর একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, “অপরাধীর অনুপস্থিতিতে বিচারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, এটিতে হাসিনার কর্মকান্ড থেকে মনোযোগ সরাবে না।”
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট যে, এই রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জবাবদিহিতার প্রতীক। যদিও অপরাধী হস্তান্তরের অনিশ্চয়তা রয়েছে, এটি হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে এবং যুবকদের আন্দোলনের বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে।
