দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানে শান্তিচুক্তি না হলে দেশটিকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইরানকে নিয়ে তাঁকে একটি ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে। একই দিনে জাতিসংঘের অধিবেশনের বাইরে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকও হয়েছে।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের অবসান সম্ভব হলে ইরান পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তবে কোনো সমঝোতা না হলে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণের সময় ইরানের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্যও সাধারণ পরিষদের হলে উপস্থিত ছিলেন। পরে ট্রাম্প জানান, তাঁর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের একটি ‘খুব ভালো’ ও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ওই বৈঠকে অংশ নেন বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। আরও একটি বৈঠক খুব শিগগির হতে পারে বলেও তিনি জানান।
ফলে একই দিনে ওয়াশিংটনের কড়া সামরিক হুমকি এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের দুটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনের বাইরে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর তৎপরতাও বাড়ছে। ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার সম্ভাবনা এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্ত নিয়ে আলোচনার কথাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প তাঁর ভাষণে বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হলে দেশটির জন্য পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে চুক্তি না হলে সামরিক পদক্ষেপ আরও কঠোর হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াতে অন্যান্য দেশকেও আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরান নিয়ে বক্তব্যের পাশাপাশি ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, দুই দেশের নেতাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং যুদ্ধের অবসান প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেননি তিনি।
ভাষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি এই প্রযুক্তির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরোধিতা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে চীনের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের কিছু কার্যক্রমেরও সমালোচনা করেন তিনি। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত ভাষণের সারাংশেও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একই অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।
ট্রাম্পের এবারের ভাষণে অভিবাসন, সীমান্ত, অর্থনীতি, অপরাধ দমন ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ও গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে তাঁর ভাষণকে একদিকে পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান তুলে ধরার বক্তব্য এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বক্তব্য হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব বা নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের পাশাপাশি আলোচনার এই দ্বৈত পরিস্থিতি এখন জাতিসংঘের অধিবেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে সামরিক সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনাও খোলা রয়েছে। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে দুই পক্ষের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান নজর।
