দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পাখি বাল্ড ঈগলের একটি বড় ভাস্কর্য উপহার দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে শি জিনপিংয়ের সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে এই উপহার দেওয়া হয়। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী তিনি ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প একজন মার্কিন শিল্পীর সঙ্গে মিলে ভাস্কর্যটির নকশায় অংশ নেন। তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন ও ঊর্ধ্বমুখী চেতনার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রশ্ন উঠেছে, চীনা প্রেসিডেন্টকে কেন এমন একটি প্রতীকী উপহার দেওয়া হলো?
বাল্ড ঈগল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের জাতীয় প্রতীক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির জাতীয় পাখির মর্যাদাও পেয়েছে। মার্কিন আইনে পাখিটিকে স্বাধীনতা ও শক্তির ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শি জিনপিংকে ঈগলের ভাস্কর্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প শুধু একটি শিল্পকর্ম উপহার দেননি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকও তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্প নৈশভোজে বলেন, তিনি আশা করেন ভাস্কর্যটি বেইজিংয়ে একটি সম্মানজনক জায়গা পাবে। কূটনৈতিক উপহার বিনিময়ের ক্ষেত্রে এমন প্রতীকী অর্থ নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে উপহার অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান এবং আলোচনার পরিবেশের একটি দৃশ্যমান অংশ হয়ে ওঠে। তবে এর অর্থ এই নয় যে উপহারটি দুই দেশের সব মতপার্থক্য দূর করে দিয়েছে।
বরং ট্রাম্প ও শির বৈঠকটি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, তাইওয়ান ও ইরানসহ একাধিক সংবেদনশীল বিষয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত থাকার সময়ে। দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরতিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি ও ট্রাম্পের এবারের বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিদ্যমান মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে উপহার বিনিময়কে ব্যক্তিগত কূটনীতির একটি উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। শির যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরুর আগেই ট্রাম্প নিজে বিমানঘাঁটিতে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান। এটিও প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার তুলনায় ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
শুধু ট্রাম্পই উপহার দেননি। শি জিনপিংও একই নৈশভোজের দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্রতীকী বার্তা দিয়েছেন। তিনি আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দুটি জায়ান্ট পান্ডা পাঠানোর ঘোষণা দেন। চীনের কূটনীতিতে পান্ডা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শি আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থীকে চীনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি নেওয়া হবে।
অর্থাৎ একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক ঈগল, অন্যদিকে চীনের বহুল পরিচিত পান্ডা। দুই নেতার উপহার বিনিময়ের এই দৃশ্যকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি প্রতীকী চিত্র হিসেবেও দেখা যাচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রীয় উপহারের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নিয়মও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের বিদেশি উপহার সংক্রান্ত ধারায় বিদেশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের উপহার গ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে এবং কংগ্রেসের সম্মতির বিষয়টি সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় উপহার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণের প্রশ্নে নির্দিষ্ট আইন ও প্রটোকল প্রযোজ্য হয়।
ট্রাম্প ও শির বৈঠকের মূল বিষয় অবশ্য ঈগল বা পান্ডা নয়। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তাগত মতপার্থক্য সামাল দেওয়াই বৈঠকের বড় লক্ষ্য। কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকও কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হোয়াইট হাউসের জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজে দেওয়া ঈগলের ভাস্কর্য তাই দুই পরাশক্তির নেতার বৈঠকের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টার একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে থাকল।
