লোড হচ্ছে...
লোড হচ্ছে...

গাজা যুদ্ধ যেভাবে মোদির মাদারল্যান্ড ভারতকে ফাদারল্যান্ড ইসরাইলের আরও ঘনিষ্ঠ করল

প্রকাশিত: 09 অক্টোবর 2026

5 Views

The Civilians News

দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান, বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনির প্রাণহানি এবং ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ার মধ্যেও দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাও প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়; বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, হিন্দুত্ববাদী আদর্শ এবং নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের মিল এই ঘনিষ্ঠতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

দুই দেশের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচের ভারত সফর। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও অধিকৃত পশ্চিম তীর ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে অবস্থানের কারণে বিতর্কিত এই মন্ত্রীকে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাঁর ও ইসরাইলের আরেক কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নেয়।

তবে ভারত সফরে স্মোতরিচকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। নয়াদিল্লিতে তিনি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের চুক্তি করেন। মুম্বাইয়ে শেয়ারবাজার পরিদর্শন এবং গুজরাটে বিনিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমেও অংশ নেন। সে সময় গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত ছিল। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সফরটি এমন এক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরে, যখন ইসরাইলের কয়েকটি দীর্ঘদিনের মিত্রও দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছিল।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির ইসরাইল সফরও দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব সামনে আনে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও আইনি চাপ চলার সময় এই সফরকে তাঁর কূটনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রতিরক্ষা খাত। মোদির আমলে ভারত ইসরাইলের প্রধান অস্ত্র ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে গাজায় যুদ্ধ চলার সময় ভারত থেকে ইসরাইলে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে ইসরাইলে অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জামের অন্তত ২ হাজার ৫৯৬টি চালান পাঠানো হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, কামানের গোলা এবং সামরিক যানবাহনের উপাদান ছিল বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টির আশঙ্কা, এসব সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি অব্যাহত থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি দায়ের প্রশ্ন উঠতে পারে। এটি অ্যামনেস্টির অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন; ভারতের সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ভারতের এই অবস্থানকে শুধু অস্ত্র বাণিজ্যের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নভদীপ সুরির মতে, দুই দেশের নিরাপত্তা ভাবনায় মিল রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ইসরাইলকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে নয়াদিল্লি। বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং কঠোর নিরাপত্তানীতির প্রতি ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের আগ্রহও এই সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার একটি ব্যাখ্যা মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যেও রয়েছে। দলটির হিন্দুত্ববাদী আদর্শে জাতীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ইসরাইলের নিরাপত্তানীতির প্রতি ভারতীয় ডানপন্থীদের সমর্থন এই রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে আরও জোরালো করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পরপরই মোদি হামলার নিন্দা জানান। পরবর্তী সময়ে ইসরাইল সফরেও তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন। কিদওয়াইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরাইলকে সন্ত্রাসবাদের শিকার রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে মোদি দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার পক্ষে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক যুক্তিও তৈরি করতে পেরেছেন। তবে এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষকদের মতামত; ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র কারণ হিসেবে একে বিবেচনা করা যায় না।

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলেও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে সমর্থন করে আসছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ভারতের প্রতিনিধি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অধিকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ, ভারতের ঘোষিত কূটনৈতিক অবস্থান এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা থেকে সরে যায়নি।

কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, ঘোষিত সমর্থনের সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরাইলের সঙ্গে অস্ত্র ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা নিয়ে সীমিত প্রতিক্রিয়া দেখানোকে তাঁরা নয়াদিল্লির নীতিগত অসংগতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে ছিল ভারত। তবে ১৯৯২ সালে ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরাইল সফর করেন। তাঁর আমলে আগে তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকা সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নিয়েছে।

সব মিলিয়ে, গাজা যুদ্ধ ভারতের ইসরাইলঘেঁষা অবস্থানকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনা এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। একই সময়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে ভারতের ঘোষিত সমর্থন এবং ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

আরও পড়ুন

Editor & Publisher : Khondaker Azizur Rahman

taraftarium24casibomselcuksportstaraftarium24selcuksportscasibom