দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত । খন্দকার আজিজুর রহমান ।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের মাঝে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অশালীন হুমকি নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, “মঙ্গলবার ইরানে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে এবং ব্রিজ ডে হবে… ফাকিং স্ট্রেইট খুলে দাও, তোমরা পাগল বাস্টার্ডস, নয়তো জাহান্নামে বাস করবে!” একদম সম্প্রতি ট্রাম্প বলেছে “এক রাতে পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে” এটা কোনো সভ্য মানুষ বা নেতার বক্তব্য হতে পারেনা। এই হুমকি যদি পারমাণবিক স্তরে পৌঁছায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকাসহ বিশ্বব্যাপী কী ঘটবে? বিজ্ঞানীদের সিমুলেশন ও আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে জানা যায়, এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিপর্যয়।
ধরুন, ইরানের কোনো বড় শহর বা পারমাণবিক স্থাপনায় (যেমন তেহরান, নাতাঞ্জ বা বুশেহর) ১০০-৩০০ কিলোটনের একটি আধুনিক মার্কিন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়। পারমাণবিক মানচিত্র (NUKEMAP) সিমুলেশন অনুসারে, বিস্ফোরণের কেন্দ্রে (ফায়ারবল) সবকিছু বাষ্পীভূত হয়ে যাবে। ১ কিলোমিটারের মধ্যে তাপমাত্রা লক্ষাধিক ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। ৫-১০ কিলোমিটারের মধ্যে ভবন ধসে পড়বে, আগুনের ঝড় উঠবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মারা যাবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হবে সবচেয়ে ভয়াবহ। ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের লক্ষ লক্ষ মানুষ তেজস্ক্রিয় ধুলো ও ছাইয়ের ঝড়ে আক্রান্ত হবেন। দক্ষিণ এশিয়ায় (পাকিস্তান ও উত্তর ভারত) পশ্চিমা বায়ু প্রবাহের কারণে ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে তেজস্ক্রিয় কণা পৌঁছাতে পারে। আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল (মিশর, লিবিয়া) সামান্য প্রভাবিত হলেও, খাদ্য ও পানির সরবরাহে বিপর্যয় ঘটবে। বিস্ফোরণের পরপরই বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
তেজস্ক্রিয়তা দুই ধরনের: প্রাথমিক বিকিরণ (প্রম্পট রেডিয়েশন) এবং ফলআউট (তেজস্ক্রিয় ধুলো)। গ্রাউন্ড বার্স্ট হলে ফলআউট সবচেয়ে বিপজ্জনক। সিজিয়াম-১৩৭, আয়োডিন-১৩১ ও স্ট্রনশিয়াম-৯০-এর মতো আইসোটোপ ছড়িয়ে পড়বে। বায়ুর গতিপথ অনুসারে ৫০০-১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত মারাত্মক ফলআউট পৌঁছাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বুশেহর পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা হলে বা পারমানবীক আক্রমণ হলে কাতার, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পানি ও খাদ্য দূষিত হবে।
তীব্র বিকিরণে তাৎক্ষণিক মৃত্যু, ক্যান্সার, থাইরয়েড রোগ, জন্মগত ত্রুটি। দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পানি ও খাদ্যচক্র দূষিত হয়ে থাকবে দশকের পর দশক। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, এমন দূষণ লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা ধ্বংস করে। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি কৃষি উৎপাদন কমিয়ে খাদ্য সংকট তৈরি করবে। আফ্রিকায় পানির সংকট আরও তীব্র হবে।
পারমাণবিক হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এই পথে যায়। তেলের দাম ১৫০-২০০ ডলার প্রতি ব্যারেলে উঠতে পারে। ইউরোপে জ্বালানি সংকট ও শিল্প বন্ধ হয়ে যাবে। এশিয়ায় (চীন, ভারত, বাংলাদেশ) আমদানি খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি ১০-১৫ শতাংশে পৌঁছাবে। আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যাভাব তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। আমেরিকায় গ্যাসোলিনের দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে মন্দা দেখা দেবে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুসারে, এমন সংকটে গ্লোবাল জিডিপি ৫-৮ শতাংশ কমতে পারে। স্টক মার্কেট ধ্বসে পড়বে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।
সাম্প্রতিক হুমকিগুলোতে ট্রাম্প বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংসের কথা বলেছেন। জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রোটোকল-১ এর ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে, বেসামরিক জনগণের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য স্থাপনা (বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য) আক্রমণ নিষিদ্ধ। এটি যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন হুমকি জনগণকে ভয় দেখানো এবং সম্মিলিত শাস্তি, যা চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন। ট্রাম্পের ভাষা (“পাগল বাস্টার্ডস”, “জাহান্নাম”) শুধু অশালীন নয়, এটি মানবিকতার পরিপন্থী। এমন হুমকি যুদ্ধকে আরও তীব্র করে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করে।
ঠিক এই মুহূর্তেই সব উপসাগরীয় দেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে অত্যান্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে নিজেদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই। যারা পারমাণবিক হামলার ভয় দেখাচ্ছে বা করতে চাচ্ছে তারা বিস্ফোরণ এর স্থান থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে, তাদের প্রতক্ষ কোনো ক্ষতিই হবে না। একটি ভারসম্যপূর্ন বাসযোগ্য পৃথিবী বিনির্মানে ইজরাইল ও আমেরিকাকে এখনই সীমিত করা খুবই প্রয়োজন। বিশ্ব শান্তির জন্য ইজরাইল ও আমেরিকার আণবিক ও সামরিক শক্তি সীমিত করতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, নচেৎ তার অচিরেই ইজরাইল ও আমেরিকার স্বেচ্ছাচারী সামরিক আগ্রাসনের স্বীকার হবে। এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে ইজরাইল ও আমেরিকাই এখন বিশ্ব শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
ইজরাইল ও আমেরিকার সামরিক ক্ষমতার দম্ভের বলি পুরো বিশ্ব হতে পারেনা। পারমাণবিক হামলা কোনো ‘সমাধান’ নয়, বরং বিশ্বমানবতার জন্য আত্মঘাতী। ক্ষমতাধর দেশগুলির অতিরিক্ত খবরদারির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস হলে দক্ষিণ এশিয়া-আফ্রিকা খাদ্য-পানি-স্বাস্থ্য সংকটে পড়বে, বিশ্ব অর্থনীতি ধসে যাবে এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হবার দরকার নেই। ট্রাম্পের হুমকি যুদ্ধাপরাধের নিশ্চিত প্রমান বহন করে, যা শান্তি নয়, ধ্বংস ডেকে আনবে। বিশ্ববাসীকে এখনই সতর্ক হতে হবে। এই সংকট শুধু ইরানের নয়, গোটা বিশ্বের।
