দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) হাইকোর্টে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানানো হয়। দীর্ঘ ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসায় মামলাটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বরাতে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে। এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনগত অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার সময় তাঁদের ছোট ছেলে বাসায় ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তের দায়িত্ব ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কাছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি সংস্থাটি।
মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং অগ্রগতি না থাকায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র্যাবের কাছ থেকে তদন্তের দায়িত্ব সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। এতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের প্রধানকে আহ্বায়ক করা হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না হওয়ায় টাস্কফোর্সকে একাধিকবার সময় বাড়ানোর আবেদন করতে হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আরও ছয় মাস সময় দেন।
অন্যদিকে, নিম্ন আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়ও বারবার পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী তারিখ ৫ নভেম্বর নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে নিম্ন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ১৩০ বার পিছিয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাগর–রুনি হত্যা মামলার তদন্তে জিয়াউল আহসানের নাম আগেও আলোচনায় এসেছে। এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অন্য একটি মামলার তদন্তে জব্দ করা তাঁর ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে উদ্ধার করা তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা সাগর–রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু সূত্র পেয়েছেন। এসব সূত্রের ভিত্তিতে কয়েকজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করার কথাও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
২০১২ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবিতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চান এবং পরে তদন্তের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তদন্তের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সময় হাইকোর্ট দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এরপরও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বারবার বাড়ানোয় বিচার প্রত্যাশী পরিবার এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা এখনো এই মামলার প্রধান প্রত্যাশা। হাইকোর্টে উপস্থাপিত নতুন প্রতিবেদনে কী কী তথ্য রয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতে তদন্তে কী অগ্রগতি হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে কী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
