দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩ জন। শুক্রবার নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ হিসাবে এ তথ্য জানা গেছে।
নতুন হিসাবে আগের দিনের তুলনায় মৃতের সংখ্যা সাতজন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ২৮৫ জন বেড়েছে। নেপালে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২৬৬টিরও বেশি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলে ২১ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে সীমান্তজুড়ে বিপর্যয়ের মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ, বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্তর ধসে ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ ঢল নামে। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বসতি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিস্তীর্ণ অংশ ভাসিয়ে নেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপর্যয়ের প্রভাবে ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিপুল প্রাণহানির মধ্যেও শুক্রবার উদ্ধার অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। ভয়াবহ বন্যার নয় দিন পর ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন যান্ত্রিক বিভাগের ফোরম্যান ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় সাহ এবং যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন।

উদ্ধারের আগে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর পাওয়ার পর উদ্ধারকারীরা সেখানে জীবিত মানুষের উপস্থিতির বিষয়ে নিশ্চিত হন। এরপর সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতরে পৌঁছানোর কাজ আরও জোরদার করে। দুই শ্রমিককে উদ্ধারের পর ওই এলাকায় আটকে থাকা অন্য শ্রমিকদেরও জীবিত পাওয়ার আশা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সঞ্জয় সাহ অন্য শ্রমিকদের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে নিজে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন। পরে তিনি সুড়ঙ্গের একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষে আটকা পড়েন। সেখানে প্রার্থনা করতে করতে তিনি বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। উদ্ধার হওয়ার পর তাঁকে ও কবির মহার্জনকে কাঠমান্ডুর সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দুর্যোগের পর থেকেই নেপালজুড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ব্যাপক অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া সুড়ঙ্গগুলোতে পৌঁছাতে ভারী যন্ত্রপাতি, খননযন্ত্র, ড্রোন, যোগাযোগ সরঞ্জাম ও বিশেষ উদ্ধার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়ানো হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া বিশেষ ড্রোন পরিচালনাকারী দল ও দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তকারী বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে।
এদিকে নতুন বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। হিমবাহধসের পর পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি প্রাকৃতিক হ্রদ তৈরি হওয়ায় সেগুলোর পানি উপচে নতুন করে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন ভূমিধস ও জলাধার তৈরির খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী ও নিরাপত্তাকর্মীদের কিছু এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতায় নেপালের অবকাঠামোও বিপর্যস্ত হয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, বন্যায় দেশটির সম্পদ, আবাসন ও অবকাঠামোতে আনুমানিক ২৫৬ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। অন্তত ৭ হাজার ৫০০টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও বরফাবৃত অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও বসতি গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে।
দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা তাই নিখোঁজদের পরিবারগুলোর জন্য নতুন আশার আলো তৈরি করেছে। ত্রিশূলী নদীর অববাহিকার বিভিন্ন সুড়ঙ্গ ও ধ্বংসস্তূপে এখনো অনুসন্ধান চলছে। উদ্ধারকারী দলগুলোর লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব জীবিতদের শনাক্ত করে বের করে আনা এবং নিখোঁজদের সন্ধান সম্পন্ন করা।
