দ্য সিভিলিয়ানস । মতামত ।
২০২৪ সালের আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ যখন রক্তাক্ত বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপ ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছিল, তখন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের কাঁধে এসে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন একজন অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি যে অসম্ভব চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরের এই শাসনামলে কিছু অপূর্ণতা থাকলেও সাফল্যের যে ঝলক তিনি দেখিয়েছেন, তা দেশকে ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে বের করে এনে গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রফেসর ইউনুসের দৃঢ়তা অতুলনীয়। পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের নিয়োগকৃত দলকানা মানসিকতার কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা সত্ত্বেও তিনি ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন ও সংবিধান সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেন। জুলাই চার্টার, যা ২৪টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরে সম্পন্ন হয়েছে, যা এই সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর অন্যতম। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, উচ্চকক্ষ গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের বিধান অন্তর্ভুক্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের সাথে গণভোটে “হ্যাঁ” তে রায় দিয়ে জনগণ এটি বিপুল ভোটে অনুমোদন করেছে। এর ফলে গণতন্ত্রের ধারা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তাঁর নেতৃত্ব অসাধারণ। দায়িত্ব গ্রহণের সময় রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছিল, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশে উঠেছিল। কিন্তু বিদায়ের সময় রিজার্ভ ৩৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে (আইএমএফ হিসাবে ২৯.৮৬ বিলিয়ন)। রেমিট্যান্স রেকর্ড ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, রপ্তানি ৯ শতাংশ বেড়েছে, এফডিআই দ্বিগুণ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অর্ধেকে নেমে এসেছে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮.৪৮ শতাংশে (৩৫ মাসের সর্বনিম্ন)। টাকার মূল্য স্থিতিশীল হয়েছে, ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার হয়েছে। এসব অর্জন জনগণের জীবনযাত্রায় স্থিতি ফিরিয়ে এনেছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর সাহসিকতা ও দূরদর্শিতা অনবদ্য। একপেশে নীতির পরিবর্তে ‘৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি’ চালু করে বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। হাসিনা আমলে বাংলাদেশ আগ্রাসী ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছিল প্রায়, যার বিরুদ্ধে বুদ্ধিমত্তা, সাহস ও সংযমের পরিচয় দিয়ে ইউনুস আবার বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে নিশ্চিত করেছেন। চীনের সাথে তিস্তা, বন্দর ও শিল্পাঞ্চল চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ট্যারিফ কমানো (৩৭% থেকে ২০%), জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি, ইউএই থেকে বন্দী প্রবাসীদের মুক্তি, সবই তাঁর দূরদর্শিতার ফসল। রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, জুলাই গণহত্যার তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা—এসব করে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
সামরিক খাতে তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য। নৌ, বিমান ও সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে উদ্যোগ নিয়েছেন, প্রশিক্ষণ বাড়িয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করেছেন, অত্যাধুনিক রাডার, বিমান, ড্রোন, মাঝারি ও স্বল্প পাল্লার উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন ও চুক্তির পথ নতুন সরকারের জন্য এগিয়ে রেখেছেন। যা নিঃস্বন্দেহে আমাদের সামরিক বাহিনীকে আরো আরো আধুনিক করে গড়ে তুলবে। নৌ ও বিমান বাহিনীর সিলেকশন বোর্ড উদ্বোধন, বঞ্চিত সেনা সদস্যদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ—এসব অল্প সময়ে অকল্পনীয় সাফল্য। নতুন সরকার যদি এই ধারা অব্যাহত না রাখে, তাহলে সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়বে।
জুলাই-আগস্টের শহীদদের বিচার, গুম-খুনের তদন্ত কমিশন, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা—এসব ক্ষেত্রেও তাঁর সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর মামলার পূর্ণ তদন্ত শেষ করা যা বিগত বছরগুলোতে সম্পন্ন হয়নি। যুবসমাজের অভ্যুত্থানকে সম্মান দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর করে গণতন্ত্রের উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
কিছু সমালোচনা থাকলেও সংকটের মধ্যে যা তিনি অর্জন করেছেন, তা অসাধারণ। প্রফেসর ইউনুসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্থিতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। জুলাই চার্টার বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশবাসী তাঁকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানায়। নতুন সরকার এই উত্তরাধিকার নিয়ে এগিয়ে যাক—‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে উঠুক।
