দ্য সিভিলিয়ানস । নিউজ ডেস্ক ।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘাঁটি খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। একই সঙ্গে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা কমার বদলে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।reuters+1
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি গত রবিবার খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারির ঘোষণা দেন। এতে প্রদেশটির প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের নেতৃত্বে গঠিত প্রাদেশিক সরকার সাংবিধানিকভাবে কার্যকর থাকবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার।

কেন এই সিদ্ধান্ত
কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, প্রদেশটিতে জঙ্গিবাদী সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, খাইবার পাখতুনখোয়ার জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে রক্ষা করতেই সংবিধানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুটি অনুচ্ছেদ কাজে লাগানো হয়েছে।dw+1
তবে ইমরান খানের দল এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন ও ক্রমবর্ধমান জনসমর্থনকে চাপা দিতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দলটি জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বলেও জানিয়েছে।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
জরুরি অবস্থা জারির পর প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। রাস্তায় শিপিং কন্টেইনার দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল, পাশাপাশি স্কুল বন্ধের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল।afp+1
পরে পেশোয়ার ও প্রদেশের বেশিরভাগ অংশে স্কুল আবার খুলে দেওয়া হয় এবং ইন্টারনেট সেবাও স্বাভাবিক করা হয়। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এখনো উল্লেখযোগ্য রয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সরাসরি নিশ্চিত না করলেও বিক্ষোভ রোধে ব্যাপক তল্লাশি ও দমন অভিযান চলছে। প্রদেশের অনেক পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
নেতাদের আটক
জরুরি অবস্থা জারির পর প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিসহ একাধিক শীর্ষ নেতাকে আটকে রাখা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার বাবর সোয়াতি, প্রাদেশিক দলীয় সভাপতি জুনায়েদ আকবরসহ একাধিক মন্ত্রীও আটক রয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী আফ্রিদির অবস্থান নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ভিন্ন দাবি রয়েছে। তার দল বলছে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, তিনি নিরাপত্তার কারণে হেফাজতে রয়েছেন।

ইমরান খানের মুক্তির দাবি
এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই খাইবার পাখতুনখোয়ায় ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বড় আকারের বিক্ষোভ চলছিল। হাজার হাজার সমর্থক মিছিল, সমাবেশ ও পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। ইমরান খানের দল এই প্রদেশে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় রয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাবন্দি রয়েছেন। তাকে একাধিক দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে তিনি বারবার দাবি করেছেন, এসব মামলা তাকে রাজনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। গত এক বছরে পরিবার বা আইনজীবীদের সঙ্গে তার সাক্ষাতের সুযোগও খুবই সীমিত ছিল বলে জানা গেছে।
সমালোচনা ও উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জরুরি অবস্থা জারির সময়টি কাকতালীয় নয়। ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি তার দলের তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার দলটিকে আরও শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো ফারজানা শেখ মনে করেন, সরকারের দেওয়া যুক্তি সন্তোষজনক নয়। তিনি বলেন, সামরিক অভিযান বাড়ালে সেনা সদস্যদের হতাহতের ঝুঁকিও বাড়বে, যা সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই প্রশ্ন তুলতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, এই পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে। তার ভাষায়, প্রদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়লে পরিস্থিতি অনেক বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

বড় চ্যালেঞ্জে পাকিস্তান
পাকিস্তান এখন একাধিক জটিল সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় পাকিস্তান প্রথম স্থানে রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশটিতে ১ হাজার ৪৫টি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে এবং ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন।
একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে নিরাপত্তা সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাকিস্তানের সামনে বহুমুখী চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাদেশিক সরকার বিলুপ্ত করাকে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাইবার পাখতুনখোয়ায় এখন কোনো নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার নেই। ফলে সেখানকার যেকোনো ব্যর্থতা বা অসন্তোষের দায় সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর পড়বে। এতে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাহিদ হুসেন মনে করেন, দেশ যখন বহুমুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে, তখন এই সিদ্ধান্ত বেপরোয়া হতে পারে। তিনি আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে দেশের অন্য প্রদেশেও এমন কঠোর ক্ষমতার ব্যবহার হতে পারে।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক প্রভাবের ইতিহাস দীর্ঘ। নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা আগেও দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তিক্ত পরিণতির জন্ম দিয়েছে। তাই ইমরান খানের শক্ত ঘাঁটিতে জরুরি অবস্থা জারির এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রদেশের প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং পুরো দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা,
